শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
বদরুজ্জামান আলমগীর এর
একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
বদরুজ্জামান আলমগীর এর একগুচ্ছ কবিতা
আদিপ্রাণ
একটি চেনাজানা দরজার পিছনে কব্জা
পুরনো জমানার চাবি ঘোরানো তালা
হয়তো ভিড় করে আছে কয়েক পাটি জুতাও
দুই ফুট বাই ছয় ফুট এক নিপাট দরজার পিছনে।
আগে কোনদিন পলকে ভাবিনি এভাবে-
একটি কাঠের দরজা বুঝি ঠিক কাঠের নয়
এ দরজা পাথরে বানানো, বানানো সাগুদানায়।
এখানে আখড়াবাড়ি, এখানে পিঠের ব্যথা
নিরাময় হয় শ্যাওলা মিশানো আকুল দয়ায়,
বৃষ্টির তারাঝাঁপ জমাট বাঁধে অপেক্ষায়।
এ দরজার আড়ালে আটপৌরে ছোটঘর
সুর ঝিমলির, যে পুরনো আগামদিনের মরশুম
অনায়াস প্রাণের ফোঁড়ে রুমাল ও নকশিকাঁথা।
এ ঘর থেকে কোন সবজি মানুষ যখনই
বেরোয় তিরিশ দিনরাত্রির যে-কোন পশর মানি
দরজায় দাঁড়িয়ে চাহে এক দয়িতা জননী ও ভগ্নী।
হাওয়ার মোচড়
একটি উপকথার আপেল হাতে হেঁটে যাই
মাটির নিচে একলা জলের নির্বাক সিথানে
পাথর নয়, ছিন্ন মাথার খুলি বিছানো আছে।
ঘুমের সমাধির ভিতরে নিমজ্জমান কল্লোলে
আল্লাহর তরফ থেকে জিব্রাইল ফেরেশতা নয়
মায়ের মর্সিয়া হাওয়ার মোচড়ে রয়ে রয়ে ভাসে।
বাবা আর পুত্র দখিনা পবনের কাছে হাত পাতে
বলে তারা- চায় না আজ শারদ বাসন্তী মঞ্জরী
ত্রাসের মুখে নাই হয়েছে- সে বরং আসুক পাশে।
আসমান ও জমিন ভাইবোন অন্ধ হয়েছে আজ
ঘ্রাণ হৃদকম্পনে পাঠ করে তারা এক বনালা গীতি
জগৎ গুটিবসন্তের পয়ারে বাঁধা ফাটা অভিলাষে।
বিগব্যাং থিওরি
তুমি একদিন হয়তো ঠিক হয়ে যাবে
হাওয়া ও সময়ের অদেখা
কিন্তু হৃৎপিণ্ডের কসম- তোমার স্পন্দন
সেদিনও থেকে যাবে এভাবেই দিব্যগতি।
তুমি উঠেছো আমার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঊর্ধ্বে
এখানেই তুমি আর আমি দুজনই অসহায়।
দেখো, আমরা যতোই চাই না কেন-
যেমন কোনভাবেই আটকাতে পারি না
প্রতি সকালের অনিবার্য সূর্য পাঠ
আমিও তেমনই ভরাট করতে পারি না
তোমার অতি অবশ্য শূন্যতা,
ঘামের ভিতরে যে নুন- সেরকম।
তোমার হাজির আর গরহাজিরের বুদবুদে
তুমি আমাকে তছনছ করে দেবার
নিপাট সংসার উছলানো নিশিপাওয়া
আমার প্রথম বিগব্যাং- অন্তরীক্ষ
মেটাভার্স ওয়ার্ল্ড তার সুরাহা করতে পারে না
সীমা আর অসীমের দোরগোড়ায়।
পুড়ে যাচ্ছি
দীপু দাস নয়, গাছে ঝুলিয়ে আমাকে
পোড়ানো হচ্ছে আমাকে, পুড়ে যাচ্ছি ভাইফোঁটা।
এমন যদি হতো- হতে পারতাম যিশুখ্রিস্ট এক
আগুনের লেলিহান থেকে, ক্রুশের জিহবা থেকে
উড়ে চলে যেতে পারতাম জেহোভার বারামখানায়,
যেতাম আমি, তাই যেতাম!
কিন্তু পারিনি, উড়ে যেতে পারিনি আমি।
জয়দেব, সন্দ্বীপ, মাখন, শিশির, ধনেশ, গনেশ
প্রদীপ, চন্দন, প্রকাশ, উদয়দা, কানাইদা, বল্লভদা
সঞ্চয়দা, সমরদা, সুমিতদা, দীপকদা, রঞ্জিত,
শিশির, শ্যামলদা, কমল ও কমলদা, সুখেন, বাদল,
নান্টুদা, খগেনদা, অবিনাশ কাকা, পদদা, সুজিতদা
নৃপেন্দ্র, পূর্ণিমা, চিনু, রীণা, রুমালি, হরিদাস বণিক
সজয়- বিজয়, জীবনদা, ভুলনা, সজীব, নূপুর, সুনীলদা
উত্তম, দেবব্রত, বিমান, সান্ত্বনা, মহীতোষ, সঞ্জীব দাস
কোনদিন বুঝিনি ওদের নাম আমার থেকে আলাদা।
তাদের কোলাহল আর মায়ার খেলা
আলগোছে রুয়ে দিয়েছে আমার ইলেকট্রোকারডিওগ্রাম
আর আমার চোখের নোনতার আড়ালে মণি।
তাই কোথাও উড়ে যেতে পারিনি জেহোভার খোঁজে,
আগুনের লেলিহান জিহবার উপর
দীপু দাসের সাথে পুড়ে যাচ্ছি, পুড়ে যাচ্ছি আমি!
অবুঝ হরিণ
এমন হয়, আগে কখনও বুঝিনি- হতে পারে তা
লোকটা জীবিত- মাছের কাঁটা বেছে ভাত খায়
চিনি ভেবে চায়ের কাপে নুন ঢেলে দেয়,
এ তেমন কিছু নয়- চিনি আর নুন দেখতে তো
একরকমই ছোট দানা দানা আর সাদা
কিন্তু মহান আশ্চর্য ব্যাপার ওইটা-
সে যখন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুঝতে পারে
চায়ে চিনি নয়, লবন মিশানো হয়েছে!
তাই আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি-
লোকটা মৃত নয়, আল্লাহর দুনিয়ায় জীবিত।
এই জীবিত লোকটিই আজকাল অদ্ভুত কাণ্ড করছে
সে একটা চাষার ছেলে, প্রায় বকলম
কিন্তু এক যাদুকরী ক্ষমতা রপ্ত হয়েছে তার।
দুনিয়া এখন বল্লমের আগায় আগায় কিলবিল করছে
বল্লমের ছুঁচালো আগা তাকেই এসে বিদ্ধ করে
যে বলে মধু মিঠা, নিমপাতা তিতা, হরিণের চোখ
কেমন ভীরু ভীরু দেখো, হাঁটতে হাঁটতে তোমার পা
ফুলে গ্যাছে- এসো আকনমেন্দির সেঁক দিয়ে দিই!
এই সাধারণ লোকটা পিসি সরকারকে হারিয়ে দেয়-
সে নিজেকে নিজের কাছ থেকে তুলে নেয়,
গাছের গোড়ার মত কেটে নিজেকে খুলে ফেলে
পাখিদের সভায় অতঃপর বাল্যসখাগণ সাথে আকসার
গান শোনে, কলমির শাক দুলতে থাকে ধুলা পান্নায়-
আমায় হাত ধরে নিয়ে চলো সখা আমি যে পথ চিনি না।
বদরুজ্জামান আলমগীর: কবি, নাট্যকার, অনুবাদক।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর।
নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। দূরত্বের সুফিয়ানা।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
ভাষান্তরিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
জালালউদ্দিন রুমির কবিতা, মসনবি : মোরাকাবা ও জলসংগ্রহ।
প্রকাশিতব্য সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা : পানপাত্রে নক্ষত্র কুচি।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
নাটক : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। পুণ্যাহ। আবের পাঙখা লৈয়া। জুজুবুড়ি। চন্দ্রপুরাণ। পানিবালা। বাঘ। পরীগাঁও। ইলেকশন বাজারজাতকরণ কোম্পানি লিমিটেড। এক যে আছেন দুই হুজুর। পিঁয়াজ কাটার ইতিহাস। ডুফি কীর্তন। ভাসিয়া যায় লাল গেন্দাফুল।।