শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
মোহাম্মদ হোসাইন এর একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
মোহাম্মদ হোসাইন এর একগুচ্ছ কবিতা
ভোর যখন হতে থাকে
একটা রেশমি পরদা সন্তর্পণে সরে যেতে থাকে
খুব মোহময় আর মায়াবী সে রেখার আরক্তিম মহিমা পুবাকাশে জাগরণের গান গায়।
যার চোখ আছে আর যার মনীষা দীপ্ত হৃদয় –
ভোরের বাতাস তাকে বুকে টেনে নেয় — শাপমোচনের কালে যেমন পৃথিবীতে গন্ধরাজ ফুল।
রাতের খোড়ল থেকে বহুজাতিক পাখি ও পতঙ্গেরা তখন দলে দলে বেরিয়ে আসে আর ছড়িয়ে পড়তে থাকে মুগ্ধ ডানার বিশ্বাসে
আমি সেসব লিখে রাখি বৃক্ষরাজির সবুজ
পাতায় পাতায় আর ছড়িয়ে দেই বোধাশ্রিত নরম হাওয়ায়…
শহরের বাড়িগুলি তখনও ঘুমিয়ে থাকে
তখনও পাখিছানারা কিংবা মা পাখিরা তাদের বিছানা গুটিয়ে নিতে নিতে ব্যস্ত সময় পার করে…
আর আমার ঘুমগুলি সূর্যের লাল জামা পড়বে বলে রাঙা চোখে চেয়ে থাকে দিগন্তের ওপারে–
বিস্ময়ে..!
জবা
একদিন সেসব সময়ের মতো লম্বা হয়ে যাবে
তখন চারদিকে শুধু আলো আর আলো
সেই আলোয় ভিজে যাবে সব…সব…
ঘাস কথা বলবে, বৃক্ষ কথা বলবে
কথা বলে ওঠবে হাত-পা সমস্ত বিবর এবং
পাখির ডানা থেকে ঠিকরে বেরোবে আলো
বিদ্যুৎরেখা…পাঁজর থেকে বয়ে যাবে চিরন্তন সে নদী…অমরাবতী…!
মাঠ মাঠের সাথে জড়াজড়ি করে আছে
ধানের বরজ থেকে আসছে শ্যামল মায়ের বাঁশি, তান
আর অন্যলোক থেকে শীতল হাওয়া এসে
গাল টিপে দিচ্ছে, বিলি কাটছে সুচেতনা চুল
এত সরলতা এত নিষ্পাপ সহজতা
মাটির কাছে, আলোক বিন্দুর কাছে
যেন ছবি আঁকে সুতুপা মেঘ, সারাক্ষণ রোদ ঝরে
যেন গান, যেন চির মিতালি মুখার্জি…!
জবা, অসীম পৃথিবী আমার
যার পাপড়িতে ভূত-ভবিষ্যৎ চারুময় হয়ে আছে
ব্যক্ত হয়ে আছে অলোক থেকে অলোকে
স্নিগ্ধ…সুবিস্তীর্ণ…
সুরিয়্যালিজম
যাকে পাইনি সে গিয়েছে বর্ষার ঢলে
দু’পাড় ভেঙে নিয়ে যেমন যায়
যেমন নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায় সবকিছু
তেমনি আমিও সে ভাঙন বুকে নিয়ে থাকি
জলের ঘূর্ণি জলকে প্রত্যক্ষ করায়
যার শক্তি নেই সে চিরদিন অবয়বহীন থেকে যায়
একদা জলের কাব্য লিখে যেত মানুষেরা
এখন, যোনির গল্প ছাপা হতে থাকে বেসামাল লাস্যতায়
আজকাল, দিন ও রাত্রির কাব্য শঙ্খ হয়ে বাজে
যাদের ঘুমগুলো সমুদ্রকে ডাকে
আমি তাদের পায়ের কাছে ঘুঙুর হয়ে থাকি
ঢেউগুলো বিমল মূদ্রার উচাটন
ঘন দুধ হয়ে ঝরে নিত্য সঙ্গমের ব্রীড়া সৈকতে
সুরিয়্যালিজমে…!
সমন
আমি এখন
আমি এখন সত্য ধরনের কথা বলব
আমি দ্রুত চেঞ্জ করে নেব আমাকে
আমার তো সবই গেছে
বাকি আছে অর্ধসত্য মা আর ছেঁড়া শাড়ি
আমি তা নিয়েই সুখে থাকব দুঃখে থাকব
ঐশি কুসুমের ভিতর দিয়ে ভোর আসছে
এই ভোরটুকু আমার এই আলোটুকু আমার রক্তের নিঃশ্বাসের…অব্যক্ত উচ্ছ্বাসের
একে আর হেলাফেলায় নষ্ট হতে দেব না… দেব না…
পিতলের ঘোড়া তুমি আর এদিকে এসো নাকো
আমি ক্ষ্যাপা হয়ে আছি
আমি খুব খুব অস্থির হয়ে আছি
কখন কী করে বসি নিজেও তা অবিশ্বাস্য মানি
ও বরাহ শাবক তৈরি হও
মৃত্যু ও মৃত্তিকা সমন পাঠাচ্ছে…
কবি মোহাম্মদ হোসাইন–এর জন্ম ১৯৬৫ সালের ১ অক্টোবর, সুনামগঞ্জে। লেখালেখি শুরু ছোটবেলাতেই। নানা পত্রিকায়, নানা মাধ্যমে চল্লিশ বছর ধরে নিরন্তর যাত্রা। কবিতাই তাঁর ধ্যান, নিমগ্ন আরাধনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে পেশা হিসেবে নিয়েছেন শিক্ষকতাকে।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
ভালোবাসা নির্বাসনে গেছে (১৯৯৫)
মেঘগুলো পাখিগুলো (২০০১)
অরণ্যে যাবো অস্তিত্বে পাপ (২০০৩)
পালকে প্রসন্ন প্রগতির চাকা (২০০৪)
ভেতরে উদগম ভেতরে বৃষ্টিপাত (২০০৬)
মেঘের মগ্নতায় রেশমি অন্ধকার (২০০৯)
বৃষ্টির গান মায়াবাস্তবতা (২০১২)
রূপপ্রকৃতির বিনম্র চিঠি (২০১৩)
নৈঃশব্দ্যের এস্রাজ (২০১৪)
অন্তিম জাদুর ঘূর্ণন (২০১৫)
বিভাজিত মানুষের মুখ (২০১৫)
অনূদিত রোদের রেহেল (২০১৫)
ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে (২০১৭)
তুমুল বেজে ওঠে অন্ধকার (২০১৯)
হায়ারোগ্লিফিক্স (২০২০)
চেনা গন্ধের মেটাফোর (২০২১)
ঈশ্বরের ছায়াচিত্র (২০২২)
ফেসবুক
Mohammed Hossain