শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৫
কবিতার প্রহর
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
কবিতার প্রহর
প্রকৃতিগত
শৈলজানন্দ রায়
নৈঃশব্দ্য যেকোনো ভাষার একইসাথে বাক্সময় এবং নৈমিত্তিক প্রতিশ্রুতি, যার মধ্যে অনুচ্চারিতভাবে অন্তর্নিহিত থাকে ব্রহ্মাণ্ডের সকল শক্তি। এই তথ্যকে বিস্মিত করে ভাষাবিদ মানুষ স্তব্ধ হতে পারেনি অথবা গাণিতিক কোনো সংকেত ব্যবহারেও ব্যর্থ– পারলে প্রকৃতিই দিতে পারে উজাড় করে… চিরঞ্জীব। এই আশকারা একদিন অমৃত হতে পারতো– সুষুন্মা! দুক‚ল ভেঙে যাওয়া পার্শ্ববর্তী নদী– ইড়া, পিঙ্গলা !
নৈঃশব্দ্যপীড়িত বৃক্ষ, নদী, আকাশ– তাদের ভাষার ঝিরিঝিরি মাহাত্ম্য কিন্তু জীবনের দিকেই। সেই বাস্তববিশ্লেষণে প্রক্রিয়ার পুরোটাই নিশ্চিত প্রাকৃতিক! ডেটাসাইন্স বলছে– জগতে সকল তথ্যই প্রকৃতিজাত!
একটা অন্যমনস্ক প্রকৃতিতত্ত্ব প্রকৃতিই আমাদের সকল উৎসের আধার। প্রকৃতপক্ষে আমাদের নিজস্ব বলে কোনো দৃষ্টিকোণ নেই। আর অপ্রকৃতপক্ষে আমরা প্রমগ্ন ভ্রমান্ধ এক অলীক ধনাঢ্যের ভণিতায়।
(ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ)
এক টুকরো কাবাবী হাড়
সাজ্জাদুর রহমান
আমার সম্পদ বলতে আর আছে
জীবনপোড়া এক টুকরো
কাবাবী হাড়
একেবারে জাদুর কাঠি
নিরন্তর
আষাঢ়ে ছোঁয়ালে চৈত্রের
ফাঁটা মাঠ
চারদিকে অগ্নিঝরা
চিৎকার
চৈত্রে ছোঁয়ালে
কালবৈশাখী তছনছ।
আমার চুম্বনে বৃষ্টির
মতোন
নেমে আসে চোখের জল
সেই জলে ভেসে যায়
স্বপ্নের খেয়া
বিপন্ন কার্ণিশে ছুটতে
থাকে অস্থির মহাকাল
আমার পকেট বলতে
মূল্যস্ফীতির হাস্যকর যুদ্ধ
মহারোগ নিয়ে কাটিয়ে
দেওয়া কবিতার মরসুম।
(ফরিদপুর, বাংলাদেশ)
ঈদের নোটিফিকেশন
রানা জামান
রাতভর চাঁদের অপেক্ষা
শেষে ফোন বলে: চাঁদ উঠেছে ঈদের!
শহরের আকাশে তখন নতুন
ভোরের সফটওয়্যার আপডেট
রোজার ক্লান্তি মুছে
যায় ঈদের ভোরের মিষ্টি আলোতে
মসজিদের মিনার থেকে ছড়িয়ে পড়ে সাদা শব্দের ঢেউ।
মানুষেরা নতুন পোশাকে
নিজেদের পুনরায় লগইন করে
কোলাকুলি যেন পুরোনো
দূরত্বের ডিলিট বাটন
রান্নাঘরে সেমাইয়ের
গন্ধে খুলে যায় স্মৃতির ফোল্ডার
ঈদের আনন্দ প্রতিঘরে
বিস্তৃত হতে থাকে নিরব ডাউনলোডে।
শিশুদের পকেটে ঝনঝন করে
ওঠে নতুন নোটের আনন্দ
শিশুগুলো হাসে, যেন
পৃথিবীর সার্ভার একটু হালকা হয়েছে
রাস্তাগুলো আজ উৎসবের
টাইমলাইনে ভেসে ওঠে
দরজায় দরজায় কড়া নাড়ে
সম্পর্কের পুরোনো নোটিফিকেশন।
কেউ মাফ চায়, কেউ
আলিঙ্গনে ভুলে যায় অভিমান
ঈদের নামাজ শেষে আকাশটা
আরও হয়ে উঠে নীল
দুঃখগুলো স্মিত হেসে আজ
দাঁড়িয়ে থাকে একটু দূরে
মানুষেরা ভাগ করে নেয়
মিষ্টি, গল্প আর আলো।
একদিনের জন্য পৃথিবী
যেন আরও হয়ে যায় মানবিক
মনের ভেতরে জমে থাকা অন্ধকার
একটু কমে যায়
চাঁদের নরম আলোতে আবার
শুরু হয় নতুন সময়
আর ঈদ লিখে
দেয়—ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় উৎসব।
(ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ)
অন্ধকারে দূর্বাঘাসে
তারিকুল ফেরদৌস
প্রেম মানে ভুলে যাওয়া দিনগুলো
আকাশ হৃদয়ে খুঁজে ফেরা।
পাহাড়ের গায়ে হোঁচট খাওয়া
এলোমেলো ছুটে চলা দিগ্বিদিক।
ফুলের দেহে আছড়ে পড়ে
বেমালুম ভুলে যাওয়া।
পাখির ডানায় ভর করে
তেপান্তর পাড়ি দিয়ে
তোমার কাছে ছুটে চলা।
প্রেম মানে খেতে চাওয়া হাওয়াই মিঠাই
প্রেম মানে নীলাকাশে ঘুড়ি উড়াই।
তোমার কাছে ছুটে যাই-
বাজবে সানাই!
বাসর রাতে ফুলগুলো সব
ধূলায় উড়ে!
সুখগুলো সব পালিয়ে যায়
অন্ধকারে দূর্বাঘাসে!
(জামালপুর,
বাংলাদেশ)
ত্যাগের শেষ নেই
গোলাম রববানী
আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে
বাংলাদেশ
আর কতবার খালি হবে হাজারো
গ্রামবাংলার বুক
শহর নগর মহানগরের বুক- বুক
তো আর কোনো ঢাল না।
বাংলা আর কতবার হবে স্মৃতিসৌধ
আর যাদুঘর
আর কতবার রাজপথ রঞ্জিত হবে
রক্তে
সমগ্র স্বদেশের হৃদয় আর
কতশতবার ফাঁড়বে
ক্ষুধার্ত বাঘের হিংস্র
নখের সব ভয়াল থাবা
আর কত সহ্য করে যাবে তলোয়ারের
আঘাত,
গুলি-বন্দুক, কামান-বোমা
আর গ্রেনেডের আঘাত
আর কত ট্রাঙ্ক-ড্রোন আর
যুদ্ধবিমানের আঘাত?
আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে
সোনার বাংলাদেশ,
আর কতবার ফিরে ফিরে আসবে
এই বাংলায়
একাত্তর থেকে চব্বিশের জুলাই
অথবা অপ্রত্যাশিত কিছু!
আমাদের কোনো দেওয়াল দুর্গ
বা প্রাচীর নেই,
নেই বর্ম হেলমেট, বুলেটপ্রুফ
জ্যাকেট, বাঙ্কার রাডার,
ঢাল কিংবা এয়ার ডিফেন্স
সিস্টেম- আধুনিক প্রতিরক্ষা।
কিছুদিন আগে তোমাকে পেয়েছিলাম
স্বাধীনতা,
আরো কিছুদিন পরে হয়তো তোমাকে
পেলাম হে মুক্তি
স্বাধীনতার জন্যে, মুক্তির
জন্যে, খোয়ালাম রক্ত
রক্তের বিনিময়ে আর কি’বা
পেলাম হে বাংলাদেশ!
হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি সব্যসাচীর
আমার পরিচয়ে
হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি আধুনিক
কবির
স্বাধীনতা’য়, তোমাকে পাওয়ার
জন্যে, হে স্বাধীনতা
হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি কবিদের
কবি’র কবিতায়
স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে
আমাদের হলো?
হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি বিদ্রোহী
কবির বিদ্রোহী কবিতায়।
যেন রক্তিম সূর্যের প্রশ্ন-
রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনর্জন্ম-
বাংলার বুকের বয়ে চলা শুধু
অবিরাম ক্ষতচিহ্ন
বাংলাদেশ: এযেন স্বাধীনতার
অনন্ত অসীম আর্তনাদ!
বাংলাদেশ, আমাদের তাগের
কোনো শেষ নেই
বাংলাদেশ, যেন আমাদের রক্তের কোনো মূল্য নেই।
(কেশবপুর,যশোর,বাংলাদেশ)
গোলাপি চাঁদ
সাদী মোহাম্মদ
আনন্দ ও সুখের ক্লাসিক গল্পের মতো
গতরাতে আকাশে ছিলো গোলাপি চাঁদ
অথচ তুমি হেয়ালি করে সে চাঁদ
ধার করা মেঘে ঢেকে দিলে
আমরা আবার ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢুকে গেলাম
স্নিগ্ধ আলো ফুলের মতো গন্ধনির্যাস হারালো
পৃথিবী আবার মুগ্ধ হবার
ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলো
ভেতরে মিহি সুতোর মতো আশা
কেটে যাচ্ছে ধারালো ইদুরের দাঁত
এই বুঝি ছিড়ে গেলো
এই বুঝি আবার পড়লে অতল
বস্তুত সাহস নিয়ে পুলসিরাত পেরোলেই
আমাদের দেখা হতো
(মোহাম্মদপুর, মাগুরা,
বাংলাদেশ)