শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গল্প: নয়াপিরান বৃষ্টি কিংবা চাঁদ
স্বপঞ্জয় চৌধুরী
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গল্প:
নয়া পিরান, বৃষ্টি কিংবা চাঁদ
স্বপঞ্জয় চৌধুরী
শোমেলা সরু রেল লাইনের উপর দিয়ে হাঁটছে। একটু আগেই একজন লোক তাড়াহুড়ো করে রেললাইন পার হতে গিয়ে কাটা পড়েছে। মানুষের ভিড় জমেছে ধরচ্ছিন্ন দেহ থেকে আলাদা হওয়া মানুষকে দেখতে। খুবই বিভৎস সেই চিত্র। শোমেলা সেই চিত্র দেখে আতকে ওঠে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার স্বামীর চিত্র। প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেলো স্বামীর কোনো খোঁজ নেই। এ বাড়ি ও বাড়ি, এ পাড়া , ওপাড়া চষে বেড়িয়েছেন। কোনো খোঁজ নেই। দুদিন পরে ঈদ। বাচ্চাগুলো বাবা ফেরার পথে চেয়ে আছে। নানা ধরনের চিন্তা ভিড় করছে তার মাথায়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলো নাকি কোনো মেয়ে মানুষের খপ্পরে পড়লো। চারিদিকে যেসব খবর শোনা যায়, সেসব খবর শোমেলার কপালের চিন্তার রেখাকে আরও ঘনীভূত করে। একটা টিনসেড বাড়িতে একরুম নিয়ে ভাড়া থাকে শোমেলার পরিবার। তার স্বামী একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ। অনিশ্চিত আয়। কোনো মাসে অনেক আয় আবার কোনো মাসে খুব কম। তবে তার আয় সম্পর্কে শোমেলাকে সবসময় একটা রহস্যের মধ্যে রাখে। অনেক চেয়েচিন্তে পরিবারের খরচ জোগাড় করে স্বামীর কাছ থেকে। সপ্তাহে দু-তিন দিন আসেন বাসায় বাকী সময়টুকু টো টো করে ঘোরেন জেলায় জেলায় । তার নেটওয়ার্কও এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তবে এবারের মতো এতো দেরি তিনি কখনো করেননি। তাই চারপাশের মানুষের কটু কথা তাকে শুনতে হচ্ছে। এই যেমন হাবুলের মা তো সেদিন বলেই বসলো
– “ পুরুষ মানুষ হইলো কুত্তার জাত, নারীর গন্ধ পাইলেই শুকতে শুকতে পেছন পেছন চইলা যায়। দেহো অন্য কোথাও সংসার পাতছে কি না?”
স্বামীকে নিয়ে কটু কথা সইতে পারে না শোমেলা তাই একচোট ঝগড়া হয়ে গেল হাবুলের মায়ের সাথে।
– “ আমার স্বামীরে নিয়া একটাও খারাপ কথা কইবানা হাবুলের মা, আমার স্বামী ফেরেশতার মতো, সে কখনো এমুন ভুল পথে পা বাড়াইতে পারে না। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যায় পড়ছে।”
শোমেলা মনে প্রাণে চায় এই প্রতিবেশিদের কটু কথা যাতে সত্য না হয়। এদিকে চারিদিকে ধারদেনা করে পাহাড় বানিয়ে ফেলছে দোকানদারও বাকী দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। হাবুলের মায়ের কাছে মাফ টাফ চেয়ে কয়েক কেজি চাল ধার করে এনেছিল সেসবও এখন শেষ। এই ঈদে দুই বাচ্চাকে কী কিনে দিবে শোমেলা তার হাতে কোনো টাকা নেই। ঘর ভাড়া জমেছে। একটা ভাই আছে সে সৌদি আরব গেছে অনেক টাকা ধার দেনা করে। তাদেরও সবার হাত খালি। বাচ্চাগুলো এসে আশে পাশের ঘরের মানুষদের গল্প করে।
-জানো মা হাবুলের বাপ ওর জন্য নতুন জামা আনছে, জুতা আনছে, আবার একটা খেলনার পিস্তল আনছে জোড়ে জোড়ে টিপ দিলে আগুন বাইর হয়।
ছোট ছেলেটা জিজ্ঞেস করে- “ মা আব্বু আইবো কবে?”
শোমেলা কোনো জবাব দিতে পারে না। প্রসঙ্গ এড়াতে দেও দৈত্যের গল্প বলতে বলতে বাচ্চাদের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে ঘুম পাড়ায়।
শোমেলার বড় ছেলে হাসান বয়স দশ বছর। ক্লাস ফাইভে পড়ে। ছাত্র হিসেবে ভালো। তবে তার পড়াশোনায় একটু ভাটা পড়েছে ইদানীং। মায়ের কান্নারত মুখ তাকে পীড়া দেয়। সে অন্য এলাকায় গিয়ে রাস্তা থেকে লোহাসাদৃশ টিন, পেড়েক, কোমল পানীয়ের মুখ্যা ইত্যাদি কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে এককেজি চাল আর কিছু সবজি কিনে আনে। শোমেলা ছেলের হাতে এই সদাই পাতি দেখে তাকে জিজ্ঞেস করে
– “ কই পাইছোস এইগুলা বাপ।”
আমি জমাইছি। জমানো টাকা দিয়া আনছি। তুই জমানো টাকা কই পাইলি মিথ্যা কইস না আমারে হাসান। ছেলে বলতে অস্বীকৃতি জানালে মা তাকে কষিয়ে একটা চড় মাড়ে। এবার কাঁদতে কাঁদতে সত্য বলে হাসান।
“ মা আমি ভাঙারি কুড়াইয়া, হেইগুলা বেইচ্যা এডি কিনছি।”
শোমেলা এবার আরও রেগে যায়। তরে কে কইছে ভাঙারি টোকাইতে। তুই কী টোকাই মান সম্মান নাই।
– “ আমার খুব খিদা লাগে মা। তোমার চোখের পানি আমার ভালো লাগে না।”
শোমেলা ছেলেদের জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। হাবুলের মা দরজায় কড়া নাড়ে।
– “কইগো হাসান-হোসেনের মা দরজা খোলো। একটা খবর আছে খোলো খোলো।”
– “ ভাবি কী খবর? কোনো খারাপ খবর।”
– “ জানিনা তোমারে কতা ডা ক্যামনে কই তোমার ভাই গেলো বেবি লইয়া খ্যাপ দিতে গোল বাগ। হাসান হোসেনের বাপেরে দেখলো এক মাইয়া মাইনসেরে লইয়া একটা বাসা থেইকা বাইর হইতে। বাড়িওয়ালারে জিগাইলো উনারা এইখানে কেন। উনি কইলো উনারা স্বামী-স্ত্রী নতুন বিয়া করছে। ঈদে শ্বশুরবাড়ি যাইতেছে।”
শোমেলা চিৎকার দিয়ে ফিট হয়ে পড়ে মেঝেতে। ও আল্লা আমি কী শুনলাম। আমার কপাল পুড়লো গো। ছোটো ছেলে হোসেন ভয় পেয়ে কাঁদতে থাকে।
– “ মা তোমার কী হইছে মা, ওমা , কান্দো কেন?
– তোর বাপে বিয়া করছে আরেকটা। তোর মায় কানবো নাকি নাচবো রে বলদা।
ওদিকে মাইকে ঘোষনা হচ্ছে ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক। আগামিকাল বায়তুন নূর জামে মসজিদের ঈদের জামায়াত সকাল আট ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হইবে। ঈদ মোবারক , ঈদ মোবারক।
শোমেলা কানে বাজলে ট্রেনের সাইরেন। সেই পিষ্ঠ লোকটার মুখের জায়গায় সে তার মুখটাকে কল্পনা করে। তার ছেলেরা রাস্তায় ঘুরছে , ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে এমন চিত্র তার চোখের সামনে ভেসে উঠলে সে চোখ মুছে উঠে বসে। মায়ের কান্না দেখে হাসান বলে-
“ মা তুমি কাইন্দো না মা, মনে করো আইজ থিকা আমরা এতিম । আমাগো নতুন জামা কাপড় দরকার নাই মা। তুমি কাইন্দো।”
আলমারিতে গতবারের যে জামাটা ছিল ওইডা একটু সেলাই কইরা দিয়ো তাইলেই হইবো।
শোমেলা চোখ মুছে দুই ছেলের চোখের দিকে তাকালে তার বুকটা ফেটে ওঠে। কাল ঈদের দিন। সব ছেলে মেয়েরা ঈদের দেখে হৈ হুল্লোর করছে আর আমার ছেলেগুলো এভাবে মন খারাপ করে বসে আছে। কার কাছে যাবে এখন শোমেলা তার হাতে কোনো টাকা পয়সাও নেই যে গ্রামে যাবে। বিপদের সময় আত্মীয়রাও যেন পর হয়ে যেছে। যখন সামর্থ্য ছিল তখন নিজেরাতো নতুন জামা কাপড় কিনেছেই আবার আত্মীয় স্বজনরাও দিয়েছে। তার এই বিপদের কথা শুনে সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশি হাবুলের মা আজ রাতে নাইটের বাসে গ্রামে চলে যাবে। বাড়িটা পুরো ফাকা থাকবে। কার কাছে সাহায্য চাইবে। বছরের এমন একটা দিন। হাবুলের মা তৈরি হচ্ছে বাড়ি যাওয়ার জন্য।
– “ ভাবি আমার এই পিতলের কলসিডা রাইখা যদি কিছু টাকা দিতেন। পোলা দুইডারে কালকে কিছু ভালো-মন্দ খাওয়াইতাম।”
– হাবুলের মা বদরাগী হলেও খুব একটা খারাপ না। সে একশত টাকার দুইটা নোট দিয়ে বলে। আচ্ছা তোমার কলসি তোমার কাছেই রাহো।
পরদিন সকালে হাসান হোসেন ঈদগাহে নামাজ পড়তে যায়। হোসেনের পাঞ্জাবির বগল ছিড়ে গিয়েছে তাই আল্লাহু আকবর বলে কানের উপড়ে দুহাত উঠানো নিয়ম থাকলেও সে লজ্জায় হাতে উঠায় না। যদি তার ছেড়া অংশটা দেখা যায়। হাসান বিষয়টা খেয়াল করে। নামাজ শেষে ভাইকে জিজ্ঞেস করে- “ কিরে ভাই, হাত উঠালিনা যে।”
– “ হাত উঠাইয়া লাভ কী ভাই, আল্লা কি আমারে নতুন জামা কিন্যা দিব। মায় কইছে ছিড়া জিনিস অন্য কাউরে না দেহাইতে।”
– হাসানের খুবই কষ্ট হচ্ছে হাটতে, তার ছেড়া স্যান্ডেলে ইতোমধ্যে অনেকগুলো পেরে মারা হয়েছে। তার পায়ে পেরেকের গুতো লাগছে।
– “ তোর খুব হাটতে কষ্ট হইতাছে নারে। আমারও হইতাছে, দেখ আমার জুতার তলেও অনেক পেরেক মাইরা আম্মা ঠিক কইরা দিছে।”
হোসেন হাসানের চেয়ে চার বছরের ছোট। নিজের ছোট ভাইয়ের এই দৈন্য দশা সে সহ্য করতে পারছে না। তোর স্যান্ডেল আমার হাতে দে। তার আমার কান্ধে চড়। হাসানের কাঁধে চড়ে হোসেন। ঈদগাহ থেকে ফিরে হাসান-হোসেন মাকে সালাম করে। মা সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। চুলায় সেমাই রান্না হচ্ছে। সকাল থেকেই আকাশে অনেক মেঘ করছিল। সেই মেঘ আরও ঘনীভূত হতে থাকে। মা কোনো মতে তাড়াতাড়ি সেমাইটা নামিয়ে নিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে কারণ সেখানে টিন ফুটো বৃষ্টি এলে রান্না করা মুশকিল। । ঘন মেঘ যেন রাত্রি নামিয়ে এনেছে। প্রচন্ড বজ্রপাত হচ্ছে । টিনের চালায় তীব্র শব্দে বৃষ্টি হচ্ছে। ঈদের সেমাই খেয়ে হাসান হোসেন মায়ের কোলে মাথা গুঁজে থাকে। মা সেই একই দেও দৈত্যের গল্প বলে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে রাত মা ছেলে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে থাকে। চারিদিকে বৃষ্টি, তুমুল বৃষ্টি। কিন্তু তাদের ঘুম কেউ ভাঙাতে পারেনা। চারিদিকে শুনশান নিরবতা যেন। হোসেনের চোখে ভাসছে নয়া পিরান, হাসান খালি পায়ে নরম ঘাসে দৌড়াচ্ছে। তার মায়ের পরনে নতুন শাড়ি, একটা নৌকায় করে যেন তারা নিরুদ্দেশ্যের পথে পাড়ি জমাচ্ছেন। নদীর হিম হিম জলে বারবার ভেঙে যাচ্ছে চাঁদ।
স্বপঞ্জয় চৌধুরী
কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক।
জন্ম : ১৯৮৪ সালের ৬ জুন।
পিতা: আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, মাতা: লুৎফুন্নেছা বেগম
জন্মস্থান: মাদারীপুর জেলার কালকিনী থানার অন্তর্গত সাদীপুর গ্রামে।
পড়াশোনা: ঢাকা কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতোকত্তোর
পেশা ও কর্মস্থল: সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সাউথ পয়েন্ট কলেজ।
লেখালেখির ক্ষেত্র: কবিতা, গল্প, অনুবাদ, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছড়া, গান, চিত্রনাট্য ইত্যাদি ।
ইতোপূর্বে কাজ করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এ্যাসিসট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর পদে।
এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় জাতীয় দৈনিক খÐকালীন সাংবাদিকতা ও সাপ্তাহিক
পত্রিকায় সম্পাদনা করেছেন। লিখেছেন বিভিন্ন দেশি বিদেশি দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকায়।
তার কবিতা ইংরেজি, চাইনিজ, সার্বিয়ান, পর্তুগীজ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান ও আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
কাব্যগ্রন্থ: পতঙ্গ বিলাসী রাষ্ট্রপ্রেম (২০১১)
কালযাত্রার ¯িœগ্ধ ফসিল (কলকাতা-২০১৬)
দ্রোহ কিংবা পোড়ো নদীর ¯্রােত (২০১৮)
মায়ের মতো পরি (কিশোর কাব্য-২০২০)
গহিনে অরণ্য নদী (২০২১)
জলাঙ্গি ও ভাঁটপুষ্পসমূহ (২০২৩)
তৃষিত ঘুমের পেয়ালা (২০২৫)
গল্পগ্রন্থ: জলপিপিদের বসতবাড়ি (২০১৩)
ডুবেছিল চাঁদ নিশিন্দা বনে (২০২১)
মৃৎচক্রের দিনগুলি (২০২৩)
প্রবন্ধ: নিগূঢ় শিল্পের কথাচিত্র (২০২১)
নিভৃত ভাবনার জলযান (২০২৪)
চিন্তকের খসড়া খাতা(২০২৫)
কয়লার ফুল (২০২৬)
অনুবাদ (কাব্য): ভিন পাখিদের স্বর (২০২২)
যৌথ ও সংকলিত গ্রন্থ: মুক্তিযুদ্ধের ছড়া কবিতা সংকলন (২০০৮), একুশের ছড়া কবিতা সংকলন (২০০৯), দেশের কথা ভাবি (২০১০), রঙিন মেঘের দেশে (২০১২), বাবাকে নিবেদিত কবিতা (২০১৯)
সম্পাদনা গ্রন্থ- International Anthology of Poetry for Peace and Humanity
সম্পাদিত পত্রিকা- অণুস্বর (২০০৮) , শিল্পসাহিত্যের ওয়েব পত্রিকা শব্দকুঞ্জ।
পুরস্কার: বামিহাল তরুণ সাহিত্য পুরস্কার-২০২২ (প্রবন্ধ-নিগূঢ় শিল্পের কথাচিত্র)
সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার-২০২০( গল্পগ্রন্থ- জলপিপিদের বসতবাড়ি)
বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার-২০২০ (কাব্যগ্রন্থ- দ্রোহ কিংবা পোড়ো নদীর স্রোত)
ইন্টারন্যাশনাল পিস এম্বাসেডর সম্মাননা(২০২০)
দাবানল সাহিত্য পুরস্কার-২০০৪ ( কবিতা- রক্তাক্ত রাজপথ)