শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গল্প: রূপালী ঈদ
মুহাম্মদ ফজলুল হক
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
রূপালী ঈদ
মুহাম্মদ ফজলুল হক
সসপ্যানে চিনি মিশানো গরম দুধে সেমাই দিয়ে ভিডিও কলে মাকে ফোন
দেয় রূপা। মুহূর্তে তার মন বিষাদময় হয়ে যায়। চোখ পানিতে টলমল হয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু
করে। তিন মাস আগে মায়ের মৃত্যু হলেও একথা ভুলে যায় রূপা। ফোন কেটে চুলা বন্ধ করে বেডরুমে
এসে বিছানার পাশের সোফায় বসে।
অগোছালো বিছানা। কিছুক্ষণ আগে সীমান্ত চলে গেছে ঈদের নামাজ পড়তে।
বাবার কথা মনে হয়। বাবা সবসময় ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে মায়ের হাতে রান্না পায়েস খেয়ে
বের হতেন। খুব সকালে মা গোসল করে পায়েস রেঁধে অপেক্ষা করতেন। নতুন পাঞ্জাবি ও পায়জামা
পরে বাবা মায়ের পাশে বসে খুশি মনে খেতেন। মা, বাবার হাতে টুপি ও জায়নামাজ ধরিয়ে দিতেন।
বাবা, মায়ের সাথে কোলাকুলি করে, দাদিকে সালাম করে ঈদের জামাতে রওনা হতেন।
আজ মা-বাবা কেউ নেই। নিজেকে শান্ত করে দু’হাত তুলে তাদের জন্য
দোয়া করে। সীমান্তও তার সাথে কোলাকুলি করে তার হাত থেকে টুপি ও জায়নামাজ নিয়ে জামাতে
গেছে। সে এসে সেমাই খাবে। সেমাই খেয়ে রূপার দিকে বড় বড় চোখ
করে তাকাবে। রূপা বুঝবে সেমাই ভালো হয়েছে। সীমান্ত এভাবেই খাবারের
প্রশংসা করে।
জীবন যেন অট্টহাসি! সময় সব নির্ধারণ করে দেয়। বাবা-মাকে প্রচণ্ড
ভালোবাসলেও তাদের মতামতের বিরুদ্ধে সীমান্তকে বিয়ে করে রূপা। জীবনে একবারই সে তাদের
বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। মা-বাবার কষ্ট তখন না বুঝলেও পরবর্তীতে উপলব্ধি করে।
বাবা বলতেন, মেয়ের বড় শখ ছিল। পর পর দুই ছেলে হলো। আমিতো মেয়ে চাইতাম। একজনের পরামর্শ
আজমীর শরীফ চলে যাই। সেখানে আল্লাহর নাম নিয়ে দোয়া পড়ে তোমাকে পেয়েছি।
মা ছিলেন সন্তান বাৎসল্যে অন্ধ। দুনিয়া একদিকে তার ছেলেমেয়ে একদিকে।
এত ভালোবাসা পেয়েও সে প্রতিদান দিতে পারেনি। এর জন্য দায়ী অবশ্য সীমান্ত ও তার সীমাহীন
পাগল করা ভালোবাসা। হেসে উঠে সে। চোখের পানি মুছে।
গোসল করে নতুন ড্রেস পড়তে হবে সীমান্ত আসার আগেই। বিছানা গুছিয়ে
গোসল করে রূপা। তার
মনে হয় অনেক দিন সাজা হয় না। আজ সে সাজবে ইচ্ছেমত। সেজেগুজে শাড়ি
পড়বে।
সাজগোজ করে শাড়ি পড়া শেষ হওয়ার আগেই সীমান্তের ফোন। ভিডিও কল
দেখে একটু অবাক হয় রূপা। সীমান্ত সাধারণত ভিডিও কল দেয় না। রিসিভ করে আরো অবাক হয় সে।
সাদা পোষাকে বহু মানুষের চেহারা ভাসছে। সমগ্র কবরস্থান যেন শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। সবাই
মোনাজাত করছে। রূপা বুঝতে পারে সীমান্ত কবরস্থানে।
সীমান্ত বলে, ঈদ মোবারক।
রূপা, ঈদ মোবারক।
একটু এগিয়ে গিয়ে সীমান্ত বলে, এইটা তোমার মায়ের কবর।
মোবাইলের স্ক্রিনজুড়ে মায়ের কবর ভেসে ওঠে। রূপা বুঝতে পারে না
কি করবে! বেশ কিছুক্ষণ কবরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে, আসসালামু আলাইকুম,
আম্মা।
কবরের মাটি কেমন অগোছালো। এলোমেলো
মাটিতে নানারকম ঘাস। সব ঘাস চিনতে না পারলেও নিচের দিকে দুটো
ফুলের গাছ দেখে চমকে উঠে রূপা। লাল দূর্বা ফুল কি সুন্দর ফুটে আছে। আরেকটি মায়ের পছন্দের
নয়নতারা। কে লাগিয়েছে এই গাছ দুটো। কেউ কি তবে জানত মায়ের পছন্দের ফুল গাছের কথা।
রূপা বলে, আরেকটু রাখ।
সীমান্ত কিছু বলে না। সে মোবাইল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
রূপা কখনো কবরস্থানে যায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর ভীষণ ইচ্ছে করতে
যেতে, কবর ছুঁয়ে দেখতে। নিষেধ ছিল বলে যেতে পারেনি। মোবাইলের স্ক্রিন স্পর্শ করে সে
মায়ের কবরের মাটির স্পর্শ অনুভব করে। মাটির মমতায় মুগ্ধ হয়। তার মন ভালো হয়ে যায়। মনে
মনে সীমান্তকে ধন্যবাদ দেয় সে।
রূপা সীমান্তকে বলে সারা কবরস্থান দেখাতে। লক্ষ্ণী ছেলের মত সীমান্ত
তাই করে। কবরস্থান গোছানো, পরিপাটি। মাঝ বরাবর পাকা রাস্তা।
দুইপাশের প্লটে প্লটে সারি সারি কবর। শিশু ও মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্য আলাদা জায়গা। উঁচু জায়গায় বন্যা হলে কবর দেওয়া হয়। গাছগাছালি তুলনামূলক কম। এক
জায়গায় জটলা। বুঝতে সমস্যা হয় না মৃত কাউকে কবর দেওয়া হচ্ছে। হে আল্লাহ রহম করো। তোমার
বান্দাকে তুমি গ্রহণ করে। বিড়বিড় করে বলে উঠে রূপা।
তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আস। এই বলে কথা বন্ধ করে দেয় সে।
সীমান্তের ফোন কেটে দেওয়ার পর অচেনা নীরবতায় ভরে যায় ঘর। কিছুক্ষণ
চুপচাপ বসে থাকে রূপা। হাতে মোবাইল, চোখে স্থির শূন্যতা। দূরে বাচ্চাদের হাসির শব্দ।
সে ধীরে ধীরে মোবাইলটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখে। আয়নার দিকে তাকায়। শাড়ির আঁচল ঠিকমতো
বসেনি। কপালে টিপটাও একটু বেঁকে আছে। সাজতে গিয়ে যে আনন্দ হয়েছিল, সেটা আরো বেড়ে গেল!
আয়নায় কাজল টানা নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে, এই চোখ শুধু তার
নয়। এই চোখে মায়ের ছায়া, বাবার আদর, সীমান্তের প্রতি একরাশ অনুচ্চারিত
ভালোবাসা জমে আছে।
আয়নার
সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে জড়ানো গাঢ় নীল রঙের জামদানি ঠিক করে হাতে কাঁচের লাল-নীল চুড়ি পড়ল।
চুড়ি বেজে ওঠার শব্দে মনে হল ভিডিও কলের স্ক্রিনে দেখা মায়ের কবরের লাল দূর্বা ফুল
ও নয়নতারার পাতা চোখের মণি হয়ে হাতে দুলছে। তার মন নেচে উঠে। কিছুক্ষণ আগে যে বুকচাপা
কষ্টটা তাকে পাথর করে দিচ্ছিল, তা এখন শরতের মেঘের মতো হালকা হয়ে গেছে।
আয়নায়
নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রূপার মনে হলো, মা যেন পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখের
কোণ আবার ভিজে উঠল। চোখের পানিতে সেই বিষাদ নেই আছে এক ধরণের অপার্থিব শান্তি। সে দ্রুত
হাতে শাড়ির কুঁচি ঠিক করল। আজ সে হারবে না। সে কাঁদবে না। আজ সে আনন্দ করবে। সীমান্তের
ওই ভিডিও কল তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে বিচ্ছেদ মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
দরজায়
চাবির শব্দ। সীমান্ত ফিরেছে। রূপা দ্রুত ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়াল। সীমান্ত ভেতরে ঢুকেই
রূপাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। শাড়িতে রূপাকে অনন্য সুন্দর লাগছে। ঈদ মোবারক বলে সে রূপাকে
জড়িয়ে ধরল। ভালোবাসার আবেশ পেয়ে রূপা নিজকে সীমান্তের কাছে সমর্পণ করল। সীমান্ত মৃদু
হেসে বলল, তোমাকে অনিন্দ্য সুন্দর লাগছে। শাড়িটা খুব সুন্দর ফুটেছে।
রূপা হাসল,
তবে কিছু বলল না। সে জানে, এই মুহূর্তগুলো ভাষায় প্রকাশ করার নয়।
সে সীমান্তকে টেনে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসাল। সেমাই রাখা বাটি
টেবিলে রাখল। ধোঁয়া ওঠা সেমাই মুখে দিয়েই সীমান্ত বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকাল। রূপার
মুখে এক চামচ তুলে দিল। তারপর সেই পরিচিত ভঙ্গিতে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো হয়েছে।
এই দুই শব্দে রূপার বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা আরো হালকা
হয়। সে বুঝতে পারে জীবন এখনো থেমে যায়নি। থামতে দেয়নি সীমান্ত।
রূপা এবার
আর কান্না চেপে রাখতে পারল না। এই কান্না সুখের। সে সীমান্তের পাশে বসে তার কাঁধে মাথা
রাখল। ফিসফিস করে বলল, তুমি আজ আমার জন্য যা করেছো সীমান্ত, তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ
করতে পারব না। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মা নেই। অথচ তুমি ঠিক সময়ে আমাকে মায়ের কাছে
নিয়ে গেলে।
রূপা জানালার পাশে দাঁড়ায়। ঈদের নামাজ শেষে ঘরে ফিরছে মানুষ।
সাদা পোষাকে বাচ্চারা দৌড় ছুটছে। মনে হচ্ছে আকাশে উড়ছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, মা বলতেন,
ঈদের দিন জানালা দিয়ে দেখা ভালো নয়। ঈদে নিজের মানুষদের সাথে গিয়ে দেখা করতে হয়।
খেতে খেতে সীমান্ত বলে, আম্মার কবরটা দেখেছ? কত সুন্দর! ফুলগুলো
নিশ্চয়ই দেখেছ। মনে হল তাকিয়ে রয়েছে আমাদের দিকে। রূপা
নীরব থাকে। কিছু বলে না। সীমান্ত আবার বলে, তুমি যেতে পারবে না
জানি। তাই ভেবেছি, তোমাকে দেখাই।
রূপা ধীরে ধীরে বলে, ধন্যবাদ।
এই ধন্যবাদে অনেক কিছু জমে আছে প্রশান্তি, অভিমান ও স্বীকৃতি।
দুজন পাশাপাশি বসে। বাইরে রোদ উঠেছে। ঈদের সকাল গড়িয়ে দুপুরের
দিকে। রূপার মনে হয়, সে নতুন করে কিছু শিখেছে। মৃত্যু সব শেষ করে না। কিছু সম্পর্ক
সময়ের ওপারেও থেকে যায়। মায়ের কবরের মাটিতে যেমন ফুল ফুটে থাকে তেমনি স্মৃতির ভেতরেও
মানুষ বেঁচে থাকে।সে মনে মনে বলে, আম্মা, আমি চেষ্টা করছি। বাইরে ঈদের শুভেচ্ছার শব্দ
ভেসে আসে। ঘরের ভেতর নীরব ভালোবাসা।
খাওয়ার পর দুজনে বারান্দায় গিয়ে বসল। দুপুরের রোদ উষ্ণতা ছড়ালেও বারান্দার টবের গাছের
ছায়ায় এক ধরণের শীতলতা আছে। রূপা সীমান্তের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, জানো
সীমান্ত, আজ খুব বেশি করে বাবার
কথা মনে পড়ছে। বাবা যখন বলতেন আজমীর শরীফ গিয়ে আমাকে চেয়ে এনেছেন,
তখন আমি হাসতাম। মনে হতো বাবা কত সেকেলে! আজ বুঝি, আমি তাদের কাছে শুধু একটা সন্তান
ছিলাম না, ছিলাম ভালোবাসার এক অলৌকিক প্রাপ্তি। অথচ সেই আমিই তাদের মনে কষ্ট দিয়ে তোমার
কাছে চলে এসেছি।
সীমান্ত
রূপার হাতটা জোরে চেপে ধরে বলল, মানুষ ভুল করে রূপা। ভালোবাসার টানে করা ভুল প্রকৃতি
ক্ষমা করে দেয়। দেখো, আজ তোমার মা-বাবা বেঁচে থাকলে ঠিকই খুশি হতেন। হয়তো তারা ওপর
থেকেই তোমাকে দেখছেন। ওই যে কবরের নয়নতারা গাছটা দেখলে না? ওটা আমি গত মাসে গিয়ে লাগিয়ে
এসেছিলাম। আমি জানতাম, একদিন না একদিন তোমাকে ওখানে নিয়ে যাব। সরাসরি নিতে পারিনি বলে
আজ ভিডিও কল করেছি।
রূপা অবাক
হয়ে সীমান্তের দিকে তাকাল। তুমি লাগিয়েছিলে? আমি ভাবছিলাম কে করল এত
কিছু! সীমান্ত মৃদু হেসে বলল, আমি যখন প্রথমবার তোমাদের বাসায়
গিয়েছিলাম বাবার সাথে দেখা করতে তখন তিনি বলেছিলেন, আমার মেয়েটা ফুলের মতো, ওকে যত্নে
রেখো।
জীবন সত্যিই
এক অট্টহাসি। হাসির আড়ালে লুকানো থাকে সহস্র প্রাপ্তির গল্প। সময় সবকিছু কেড়ে নেয় ঠিকই
কিন্তু স্মৃতির আল্পনা দিয়ে নতুন করে জীবন সাজানোর সুযোগও দেয়।
আকাশের রঙ এখন আগুনের মতো লাল। রূপা আর সীমান্ত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে
দেখছে সূর্য ডুবছে। গোধূলির রং মিশে ঈদের চাঁদ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। রূপা মনে মনে
বলল, বাবা-মা, তোমরা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। তোমাদের মেয়ে আজ খুব সুখী।
সীমান্ত
আলতো করে রূপার মাথায় হাত রেখে বলল, তুমিতো অনেক সংসারী বউ হয়েছো।তোমার-বাবা দেখলে
খুব খুশি হতেন। রূপা হাসল। সেই হাসিতে কোনো বিষাদ নেই, অভিমান নেই, দুঃখবোধ নেই। আছে
আগামী দিনের বেঁচে থাকার
নতুন সংকল্প। সে বুঝেছে, মানুষ মরে যায় না। তারা বেঁচে থাকে আনন্দ
হয়ে। আমাদের কাজে, স্মৃতিতে এবং ভালোবাসার প্রতিটি স্পন্দনে।