শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গল্প: টুকাই বন্ধুর ঈদ
এহছানুল মালিকী
টুকাই বন্ধুর ঈদ
এহছানুল মালিকী
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন– এই বিশাল শহরের বুকের ভেতর যেন আরেকটা ছোট্ট শহর। সারাদিন ট্রেনের হুইসেল, মানুষের চিৎকার, কুলি ডাকার শব্দ, ভাজা মুড়ি আর চায়ের গন্ধে মিশে থাকে জীবনের এক অদ্ভুত ছন্দ। সেই ছন্দের মাঝেই বড় হতে থাকা এক ছোট্ট ছেলে–জয়নাল। তবে বেশিরভাগ মানুষ তাকে চেনে ‘টুকাই’ নামে।
তার সকাল শুরু হয় আজানের সুরে নয়, ট্রেনের ব্রেক কষার কর্কশ শব্দে। কাঁধে পুরোনো বস্তা, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, চোখে অভ্যাসগত ক্লান্তি, তবু কোথাও একটা বেঁচে থাকার জেদ। কাগজ, প্লাস্টিক, বোতল কুড়িয়ে যা পায়, তা বিক্রি করে। কোনোদিন একবেলা পেট ভরে, কোনোদিন আধপেট। রাত হলে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে পাটের বস্তা পেতে শুয়ে পড়ে। আকাশটাই তার ছাদ, রেললাইন তার বিছানা।
বাবা-মা আছে কি না, সে জানে না। মনে পড়ে না কোনো মুখ, কোনো কোলে মাথা রাখার স্মৃতি। শুধু মনে পড়ে ক্ষুধা আর একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস।
এক দুপুরে, তপ্ত রোদে প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। জয়নাল কাগজ তুলছিল। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় একটি স্কুলপড়ুয়া ছেলে। পরিপাটি সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট, কাঁধে ব্যাগ। নাম অয়ন।
“এই, তুমি কি প্রতিদিন কাগজ কুড়াও?”
জয়নাল একটু ভয় পায়। ভাবে, হয়তো তাড়িয়ে দেবে।
“হ, হ্যাঁ।”
“তোমার নাম কী?”
“জয়নাল, তবে সবাই টুকাই বলে।”
অয়নের চোখে মায়া ঝরে পড়ে। সেই দিন বাড়ি ফিরে সে মাকে বলে, “মা, স্টেশনে একটা ছেলে আছে। আমার মতোই বয়স। কিন্তু স্কুলে যায় না, কাগজ কুড়ায়। আর তা বিক্রি করে খাবার খায়”।
পরদিন অয়ন তার পুরোনো বই, খাতা, পেপার গুছিয়ে নিয়ে জয়নালের কাছে নিয়ে আসে।
“এগুলো নাও, বিক্রি করলে টাকা পাবে।”
জয়নাল প্রথমে নিতে চায় না। “তোমার লাগবে না?”
“না, আমার নতুন বই আছে।”
সেদিন তাদের চোখে যে বিশ্বাসের সেতু তৈরি হয়েছিল, সেটাই ছিল বন্ধুত্বের প্রথম ইট।
অয়নের স্কুল স্টেশনের কাছেই। টিফিনের সময় সে স্টেশনে চলে আসে। দুই বন্ধুর একসাথে বসে খাবার খাওয়ার দৃশ্যটা ছিল অন্যরকম। কখনো সমুচা ভাগাভাগি, কখনো ডালপুরি। অয়ন নিজের পানির বোতল এগিয়ে দেয়। জয়নাল প্রথমে সংকোচে থাকে, পরে হাসে।
ধীরে ধীরে গল্প বাড়ে। অয়ন তাকে অ আ ক খ শেখায়। প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় আঙুল দিয়ে লিখে-
“জ-য়-না-ল”।
জয়নাল নিজের নাম লিখতে শিখে একদিন। তার চোখে তখন এমন আলো, যেন সে কোনো রাজ্যের সিংহাসন জিতেছে।
রমজান মাস আসে। সন্ধ্যায় ইফতারের সময় স্টেশনের বাতাসে ভেসে আসে ছোলা-চপের গন্ধ। অয়ন মাঝে মাঝে বাসা থেকে অতিরিক্ত ইফতার এনে জয়নালের সঙ্গে ভাগ করে খায়।
“আজকে মা বলেছে, তোর জন্য আলাদা করে পেঁয়াজু ভেজেছে।”
জয়নাল চুপ করে খায়। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা জমে।
ঈদ আসছে। শহরের দোকানে রঙিন জামা, জুতো, খেলনার বাহার। অয়নের বাবা-মা তাকে নতুন শার্ট, প্যান্ট, জুতো কিনে দেন। আয়নায় নিজেকে দেখে অয়ন খুশি হয়, কিন্তু সেই খুশির ভেতর কেমন যেন একটা খচখচে কাঁটা। সে ভাবে,
“জয়নালের তো কেউ নেই। ও ঈদে কী পরবে? ঈদের দিনও কি সেই পুরোনো ছেঁড়া জামা?”
ঈদের আগের রাত। অয়ন আলমারি খুলে বসে। গত বছরের একদম ভালো একটা শার্ট-প্যান্ট বের করে। বাবাকে সব খুলে বলে। বাবা গভীরভাবে শোনেন, তারপর বলেন–
“বাবা, ঈদ মানে শুধু নিজের আনন্দ নয়, অন্যের মুখে হাসি ফোটানো।”
মা প্যাকেটের সঙ্গে নতুন একজোড়া স্যান্ডেলও গুঁজে দেন।
“ও যেন লজ্জা না পায়।”
ঈদের সকাল। নামাজ শেষে অয়ন দৌড়ে যায় স্টেশনে। চারপাশে মানুষের ভিড়, হাসি, কোলাকুলি। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের এক কোণে জয়নাল চুপচাপ বসে।
“ঈদ মোবারক, টুকাই!”
প্যাকেটটা হাতে দেয় অয়ন।
জয়নাল হতভম্ব। খুলে দেখে নতুন জামা। হাত কাঁপে।
“আমার?”
“হ্যাঁ, তোর জন্যই।”
জয়নাল দ্রæত পুরোনো জামা খুলে নতুনটা পরে। কাঁচের জানালায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। চোখে জল গড়িয়ে পড়ে।
“আজ আমারও ঈদ হলো।”
অয়ন তাকে বাসায় নিয়ে যায়। অয়নের মা দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলেন-
“এসো, বাবা।”
টেবিলে সেমাই, পোলাও, মাংস। জয়নাল প্রথমে দ্বিধায়, পরে ধীরে ধীরে খেতে শুরু করে। তার হাসিতে যেন ঘর ভরে যায়।
সন্ধ্যায় তারা আবার স্টেশনে ফেরে। আকাশে ঈদের চাঁদ ম্লান হয়ে গেছে, কিন্তু দুই বন্ধুর হৃদয়ে নতুন এক আলো জ্বলে উঠেছে। সেদিন জয়নাল বুঝেছিল, দুনিয়ায় সে একা নয়। আর অয়ন বুঝেছিল, ঈদের সবচেয়ে বড় উপহার হলো একটি হাসি।
কমলাপুরের রেললাইন সেদিনও ট্রেনের শব্দে কাঁপছিল, কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেই জন্ম নিয়েছিল এক নির্মল গল্প, বন্ধুত্বের, মায়ার, আর সত্যিকারের ঈদের।
এহছানুল মালিকী
ড. আ. ন. ম এহছানুল মালিকী। জন্ম : ঢাকার মুগদাপাড়া। পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ বেতারে সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি তিনি ‘বাংলাদেশ প্রতিবেদনের’ একজন সিনিয়র সাংবাদিক। এছাড়াও তিনি দৈনিক পত্রিকা ও মাসিক পত্রিকায় লেখালেখিতে রয়েছেন। তার সর্বপ্রথম ২০২০ সালে একুশের বইমেলাতে ‘মুক্তিরপথের অগ্রদূত : নেতাজি সুভাষ (সম্পাদিত), ২০২১ সালে উপন্যাস ‘ভালোবাসার পাঞ্চক্লিপ, ২০২১ সালে ‘বাবাবৃক্ষ’ (সম্পাদিত), ২০২১ সালে ‘সম্পর্কের বৃত্ত’ (সম্পাদিত), ২০২১ সালে ‘হেরার জ্যোতি’ (সম্পাদিত), ২০২১ সালে নীতিতে আপোষহীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব (সম্পাদিত) প্রকাশিত হয়। তিনি ২০২১ সালে নবকন্ঠ প্রকাশনী হতে সেরা লেখক ও ২০২২ সালে উপন্যাস ‘ভালোবাসার পাঞ্চক্লিপ’-এর জন্য বাংলাদেশ তারুণ্য সাহিত্য একডেমি হতে সেরা কবি-লেখক সম্মাননা পান। anm_maliki@yahoo.com