শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
গোলাম কিবরিয়া পিনু’র একগুচ্ছ কবিতা
গোলাম কিবরিয়া পিনু’র একগুচ্ছ শীতের কবিতা
শীতকালে কালিজিরা ফুল
শীতকালে ফোটে
কালিজিরা ফুল
নেইতো ভেষজগুণ!
যমুনাগর্ভ থেকে বের হয়ে
কাকে করি খুন?
কালোজাম কালো টাকা
ও কালোবাজার!
ঘিরে ধরে আছে
আরও কালো পাহাড়!
রাজস্ব আদায় করেছে
যে কালেক্টর
সে তো পালিয়ে গিয়েছে
দূরের বিভূঁইয়ে!
আমরা রয়েছি যত ফুল
কুয়াশায় নুয়ে!
হিমকর
হিমকর!
এই হিমেল দিনেও
খোলা প্রান্তরে এসে উপস্থিত হয়েছি,
তোমার রূপমাধুর্যে
সৌন্দর্যমণ্ডিত হবো আমিও!
আমারও জমেছে মেদ ও ক্লেদ!
আলোকশূন্যতা নিয়ে
বড় অসহায় হয়ে আছি!
অঙ্কুরোদগমও হচ্ছে না
চারাগাছও বাঁচছে না!
আমাদের গগনতলে
স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে পারো,
তোমার দীপন ও উজ্জ্বলনে!
আমরা তো দীর্ঘস্থায়ী রোগে জর্জরিত!
আমরা তো মৃত্যুজয়ী হতে চাই
তোমার আলোকশক্তিতে,
স্যানিটেরিয়ামে
শস্য-উৎসবে!
পর্ণশালায় মাস্তান-শীত
মাস্তানদের কাছ থেকে শীত এলো
নিভৃত দোচালা ঘরে–
তারপর গুরুভার নিয়ে অন্ধকার!
এই শীতে টুকরো টুকরো হয়ে যাই–
এ তল্লাটে এত শীত! গীত গায়–
যে সোনাচড়াই
সে-ও মধ্যরাত থেকে কণ্ঠনীল
কোন্ সংক্রান্তি?
আত্মসম্মানের বিপরীতে ছড়িয়ে দিয়েছে ভ্রান্তি!
বিনাভূমিকায় শীত আসে না গ্রীষ্মপ্রধান দেশে
সপ্তাহ ও মাসব্যাপী শীত–
পৌষ-মাঘ তার সহোদর মাস
বিষাদমগ্নতা নিয়ে শিশিরের ঘাস!
শীত অভিমুখী হতে হতে
পড়ে যাই কোন্ বরফের মুখে?
অগ্নিকোণ যদিবা না থাকে–
উত্তুরে-হাওয়া কোন্খানে নিয়ে যাবে?
আমি বন্ধ করে রাখি ঝাঁপি
পর্ণশালায় মাস্তান-শীতে কাঁপি!
শীতকালে ঘূর্ণিবায়ু
শীত আসছে– ধীরে ধীরে
তা টেরও পাচ্ছো,
ঠান্ডায় সামনের দিনে আরও জমে যাবে!
পুরনো গরম কাপড় আলমারি থেকে
ট্রাঙ্ক ও সুটকেস থেকে বের করে রাখো,
পুরনো শীতবস্ত্র না থাকলে
নতুন শীতবস্ত্র সংগ্রহে মনোনিবেশ করো।
চাদর ও সোয়েটার, কাঁথা ও কম্বল,
লেপও কাছে রাখো।
শীতবস্ত্র–শীতে হয় অস্ত্র!
উত্তরের হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা পড়ে–
গ্রীষ্মকালীন দেশেও বরফের আনাগোনা,
এত ঠান্ডা ঘূর্ণিবায়ুসহ কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে
তোমার দিকেই ধেয়ে আসবে!
গত শীতকালের কথা মনে করে এবার তোমার
সংবিৎ ফিরে আসছে না!
পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার অভ্যেস তোমার নেই
তোমার কাঁঠাল তোমাকেই ভাঙতে হবে,
পরের ইচ্ছেয় মন্ত্রপাঠ করে–কোনো লাভ নেই,
ছলাকলায় ও মন্ত্রে এ-শীত কাটবে না!
কাঁপা ও কাঁপুনি কাকে বলে
তুমিও তা জানো!
উঠানের খড় ও খড়িতে–
প্রয়োজনে আগুন জ্বালিয়ে তাপ নাও!
তাপ ছাড়া হিমপাতে তোমার মতন মানুষের
বেঁচে থাকবার আর কোনো পথ নেই!
পরিযায়ী পাখি
পরিযায়ী পাখি
তীব্র শীত অনুভব হলে–
আমার নিঝুম দ্বীপে এসো,
খড়মের খড়খড় শব্দ শুনবে না!
টাঙ্গুয়া হাওর ও বাইক্কার বিলে এসো
কোনো লুণ্ঠনকারীর ঘোড়ার খুরধ্বনিও শুনবে না!
সোনাদিয়া কিংবা পদ্মা তীরে–
তীব্র শীতেও জ্বালাবো না জ্বালানি কাঠ,
ধোঁয়ায় তোমার যদি কোনো কষ্ট হয়
–ও অতিথি পাখি!
কোনো বেয়াদব বাদ্যযন্ত্র বাজাবে না!
নিরাপত্তা যখন-তখন যেখানে-সেখানে
উধাও হয়েছে,
এখানে হবে না!
নিরাপদ আশ্রয়টুকু তোমাকে দেব–
চোর ও লম্পট হওয়ার কোনো দাগ নেই,
আমার ললাটে!
লালসায় দুর্বিনীত হইনি এখনো!
পরিযায়ী পাখি–
তুমি তীব্র শীতে,
ঠাণ্ডা ও বরফে থাকতে পারছো না–
সাইবেরিয়ায়,
তিব্বতের হ্রদে,
মঙ্গোলিয়ায় কিংবা অন্য কোনোখানে!
গানে গানে আমার এখানে চলে এসো
উদ্দীপ্ত বিশ্বাসে,
পরিশ্রান্ত হয়ে আসার পরই–অবসাদ কেটে যাবে,
আগের মতন।
আমাদের উদার ঔদার্য ভালোবাসা
তুষারাবৃত হয়নি এখনো–
কিংবা হিমাঙ্কের নিচেও যায়নি!
গোলাম কিবরিয়া পিনু , মূলত কবি। প্রবন্ধ, ছড়া ও অন্যান্য লেখাও লিখে থাকেন। গবেষণামূলক কাজেও যুক্ত। গোলাম কিবরিয়া পিনু-এর জন্ম ১৬ চৈত্র ১৩৬২ : ৩০মার্চ ১৯৫৬ গাইবান্ধায়। গাইবান্ধা শহরে মূলত শৈশব-কৈশোর কেটেছে। পড়েছেন গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এর পর মাধ্যমিকÑগাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে, এর পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা : স্নাতক সম্মান (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) এবং স্নাতকোত্তর; পিএইচ.ডি. । ১৯৮৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে ঢাকায় বসবাস করেন। লিখছেন তিন দশকের অধিককাল। এর মধ্যে কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলে ২৬টি গ্রন্থ বের হয়েছে–বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। বিশ্ববাংলা কবিতা, উত্তম দাশ, মহাদিগন্ত, কলকাতা, ২০১৩, পৃষ্ঠা-১৪৩ কবিতার বই ছাড়াও তাঁর ছড়ার কটি বই আছে। আছে বাংলা নারীলেখকদের নিয়ে গবেষণা গ্রন্থ, যা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠা থেকে নারী লেখকদের সৃজনশীলতা ও বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবদান বিশেষভাবে এসেছে। নারী লেখকদের সাহিত্য-ভূমিকা, সৃজনশীলতা, জীবনচেতনা, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ভূমিকার বিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে । এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে প্রবন্ধের বইও রয়েছে। শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর-সহ ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর রয়েছে ভূমিকা। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রতিবাদ-কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গাইবান্ধায় অনুষ্ঠিত প্রথম ছাত্র মিছিলে নেতৃত্ব দান, ১৯৭৫-৭৭ পর্যন্ত হুলিয়া ও গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সে-সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কবিতা লেখা ও তা ‘সাপ্তাহিক মুক্তিবাণীসহ অন্যান্য সংকলনে ছাপা। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ও ধর্মান্ধ-মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য ও এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ-এর সদস্য। এখনো কটি সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। পেশাগত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, বলিভিয়া, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ পর্যন্ত একটি আর্ন্তজাতিক মিডিয়া বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’-এর সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। এর আগে এফপিএবিতে উপপরিচালক (এডভোকেসি), ফোকাল পয়েন্ট ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া এফপিএবি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘সুখী পরিবার’-এর সম্পাদক হিসেবে ১৯৮৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিসিসিপি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যুক্ত ছিলেন। পেশাগতভাবে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, কলামলেখা, সম্পাদনা ও এডভোকেসি বিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছেন।