শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
সৌম্য সালেক এর একগুচ্ছ কবিতা
সৌম্য সালেক এর একগুচ্ছ কবিতা
পরিযান পত্র
জীবন এক প্রখর পরিযান
দীর্ঘ জাগরণে ছিল
স্বপ্নেও ছিল সেই অনাবিল হাতছানি–
আবাল্য উচ্ছ্বাস মাখা
তাই পরিযান ছিল দিকে দিকে, বাধভাঙা
পাহাড়ে পাহাড়ে, পাথারের সীমাহীন সৈকতে
পরিযান ছিল শরতের শান্ত নদীতে
ভাসানের স্রোতে মধুময় ভাটিয়ালি শুনে–
শুভ্র মেঘের মতো ভেসে…
পরিযান ছিল অনিকেত মরুদেশে–
পাথর ছড়ানো পথে
ক্রুদ্ধ-প্রহরীর মতো নগ্ন-পাহাড় ফেলে পিছে
আমি সারারাত জ্বলতে দেখেছি তারা অর্বুদ রূপোর অক্ষরে
একদিন পরিযান ছিল পোখারার শ্যামল বিছানা ভালোবেসে
ভালোবেসে তার হিমগুহা, শান্ত জালের নিসর্গ সমাচার।
নিশিদিন পর্যটন ছিল কায়রোর বাজারে বাজারে
নীলনদে পালতোলা আনন্দ-বাগিচায়
সেখানে ঘুমিয়েছে যারা হাজার বছর আগে
পরিযান ছিল তাদের চোখের দিকে চেয়ে!
এক শীতে পাখি-পরিযানে জেদ্দার নিঃসীম পাথুরে প্রান্তর দেখে মনে হল:
মানুষ তরলের ধারা, পথে গুলে মিশে আছে জীবনের তুমুল তটিনিতে
এসব দেখতে এসেছি আমি ঘুরে ঘুরে–
প্রাণখুলে, সুদূর পল্লীতে
শহর-নগরে, লোকে লোকে–
সময়ের নিরন্ত পার্বণে…
দাঙ্গার অভিপ্রায়
যদি সম্ভব হতো মানুষের সঙ্গে মাংসাসি প্রাণীদের যুদ্ধ বাধাতাম
রক্তপায়ী প্রাণীদের উসকে দিতাম শহর-বন্দরের অভিমুখে
মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতাম হিংস্র-প্রাণীদের
এবং রাগী সাপিনীদের বলতাম নগরের কেন্দ্রে হানা দিতে!
যদি সম্ভব হতো, মানুষের তৈরি বোমার জ্বালানি-যৌগ হিসেবে ব্যবহার করতাম মানুষেরই দেহাবশেষ
মানুষের বিরুদ্ধে আয়োজিত পশুদের বিদ্রোহসভায় যোগ দিতাম
তুমুল সৌরউৎক্ষেপনে অতিষ্ঠ করে তুলতাম মানুষের জীবন
এবং মানুষের আগ্রাসন ঠেকাতে ডেকে আনতাম নগ্ন এলিয়েনদের!
মানুষ কীভাবে এলো সমুখে
কোন অধিকারে মানুষের নাক এত উঁচা
কী আছে মহত্ত্ব তার?
একা মানুষ তো নয় পৃথিবীর অধিবাসী!
সকল জীবের সকল প্রাণীর সমান ভাগ পৃথিবীতে
তবু মানুষ হাতে কেনো শাসনের ছড়ি?
মানুষ তার খেয়াল খুশি মতো কেবল শক্তির অধিকারে ভাগ করে নিয়েছে ভূমি
এবং প্রভূ হয়ে বসে আছে!
মানুষের দুঃশাসনে বিপন্ন পৃথিবীতে নিরাপদ নেই কেউ
বিচারের দণ্ড তবু তার হাতে কোনো?
আমি আজ চরম শাস্তি চাই মানুষের!
ভালোবাসা ব্যতিরেকে
সবকিছু ভালোবাসা যাবে
সাগর সৈকত, নদী কূলু-কূলু
পাহাড়ের সীমাহীন শাণ– সবুজ সংসার
পাথরের চাঁই কিংবা সন্ধ্যার প্রসন্ন পারাপার
সব কিছু পাবে, সব কিছু চাওয়া যাবে দেশে
প্রিয় মানুষের কাছ থেকে।
শুধু অন্যকোনো রমণী বা পুরুষের প্রেমে আপতিত হলে যত বাধা
প্রেমের গুঞ্জনে যত ভয়, যত সংশয়-দ্বিধা;
সব ঝনঝন সাঁইসাঁই শনশন শব্দ এখানে
তলোয়ার হাতে ধেয়ে আসে বিধি–
ধর্ম ও সমাজের!
মেঠো স্বপ্ন
আমার স্বপ্ন গুরুতর কিছু নয়;
শরতের স্নিগ্ধ নদীর পাশে নৌকা-পাল, মাঝি
আর সুগভীর তান ভাটিয়ালি…
আমার স্বপ্ন পরিপাটি কিছু নয়;
নয় কিছু অধরাসম্ভব
শ্যামল দিগন্তের অভিমুখে–
আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সড়ক আর আমারি অপেক্ষায়
একজন– মুখনত, রঙিন রিক্সার পাশে দাঁড়িয়ে;
বৈকালিক বাতাসের উৎসবে মেতে
ভেসে যাবো ধিকি ধিকি টুং টাং স্বর মেখে
ধীর–
ঢিমেতাল রথে;
আমার স্বপ্ন সেই মধুর পরিযান!
আমার দুয়ারে কেউ
আমার দুয়ারে কেউ কড়া নাড়ে ঘুমের প্রহরে
কাঠের তোরণ করে ঠকঠক, বাজে ঘোর অশ্বখুরধ্বনি
আমার কিনারে কার অমোঘ ইশারা
উঁকি দেয় কীসের আভাস, গুনগুন কীসের কাহন স্বরে অধিরোজ!
কে তুমি নিজের আড়ালে হাসো
কে তুমি ঘুমের গোপনে ভাসো
কে ওগো মুখর-প্রাঙ্গনে চুপ!
তন্দ্রার অপলাপ মুছে কত আর দাঁড়াবো রোজ
মোহে আর কতটা জড়াবো
বার্তা যদি থাকে কিছু, পড়ো তার সরল ঘোষণা;
সবখানে সংশয় হলে, কী করে সারবে অসুখ!
সৌম্য সালেক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, রমনা, ঢাকা।