শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
গল্প: কুয়াশা ভেজা ভোর
মুহাম্মদ ফজলুল হক
শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা
শিশির ভেজা ভোর
মুহাম্মদ ফজলুল হক
রাতের গভীরতা নির্ণয় করতে না পারলেও শীতের তীব্রতা ঠিকই অনুভব করছে শামীম। ছনের তৈরি নরম বিছানায় পাতলা কাঁথা জড়িয়ে ভালো ঘুম হলেও প্রচণ্ড শীতে তার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসে সে। হঠাৎ মিনুর কথা মনে পড়ে। শীত উড়ে যায়। শীতের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় শামীম। শীতই তাকে মিনুর কাছে টেনে নিয়ে যাবে। দ্রুত উঠে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ পরই মিনু আসবে। তাকে নিয়ে সে কুয়াশা উপভোগ করতে যাবে।
মিনুও সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ভোরে বের হওয়ার উত্তেজনায় অস্থির। কুয়াশার আধিক্যে বেশি দূর দেখা যায় না। পরিচিত পথ ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ায়। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। পিছন দিক থেকে শামীম এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। ভালোলাগায় মিনুর চোখ বন্ধ হয়ে আসে। শামীমের এই ব্যাপারটা সে সবসময়
উপভোগ করে। তারা হাত ধরাধরি করে এগুতে থাকলেও রাগে মিনুর গাল ফুলে উঠে। কেন শামীম তাকে আরো বেশিক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখল না।
এদিকে শামীমের খেয়াল নেই। উঁচুনিচু পথ ধরে দৌড়ে সে জমির দিকে নেমে যায়। মিনুর পক্ষে তাল মিলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তারা খেয়াল করে রাত এখনো শেষ হয়নি। ভোর হতে অনেক দেরি। চারপাশ কুয়াশার চাদরে মোড়া। কিছুদূর এগিয়ে জমি থেকে উঠে চৌধুরী বাড়ির ভাঙা মসজিদের পাশে এসে পাশাপাশি বসে। ভাঙা মসজিদ বলতে তেমন কিছুই নেই। সামান্য ইট-শূড়কির অস্তিত্ব শুধু চোখে পড়ে। লোকমুখে শোনা যায়, বহু চেষ্টার পরও চৌধুরী বাড়ির লোকজন মসজিদটি সম্পূর্ণ করতে পারেনি। জায়গাটা নিস্তব্ধ। পাশে পুকুর। পানি থেকে বাষ্প উঠছে। নানা প্রজাতীর মাছের হুটোপুটিতে পানি সর্বক্ষণ নড়ছে।
আকাশ আজ একটু ধোয়া-ধোয়া। ঠান্ডা বাতাসে ভোরের নীরবতা ভেঙে শামীম মৃদু স্বরে বলে, চল, শিশিরভেজা ঘাসে আমাদের নাম লিখি।
মিনু চোখ তুলে তাকায়। তার চোখে ভোরের আলো-আধাঁরি। ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।
না…। আরেকটু বসো। তোমার হৃদয়ে নাম লিখব?
শামীম থমকে যায়। মুহূর্তের জন্য সময় দাঁড়িয়ে পড়ে। মিনুর উষ্ণ নিঃশ্বাস তার বুকে লাগতেই সে নিজেকে সামলে নেয়। মিনুর মুখ তুলে কপালে আলতো চুমু দিয়ে শামীম বলে, হৃদয়ে নামতো হৃদয় বিনিময় করে লিখব। এখন চল শিশিরে পা ভিজিয়ে বীজতলায় নাম লিখি।
শামীম মিনুর হাত ধরলে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে মিনুর সারা দেহে। ভেতরে ভেতরে গলে গেলেও থেমে যায় মিনু। দু’জন পাহাড়ি ঝর্ণার স্রোতের মতো নিচে নেমে আসে। তারপর শুরু করে দৌড়। উড়ে যায় ভোরের আলো ভেদ করে। ধানের সবুজ গালিচা তাদের সামনে বিছিয়ে রয়েছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। শিশিরে মোড়া সিগ্ধ চারপাশ।
বীজতলায় এসে তারা আলাদা হয়ে দু’দিকে ছুটে যায়। মিনু দৌড়ায় ইংরেজি ‘M’-এর মতো করে। শামীম আঁকে ‘S’। মাঝখানে মিলিত হয়ে দুই রেখা
ধনাত্মক হয়ে উঠলে মনের মাজারে ইতিবাচক চিহ্ন বয়ে যায়। শিশির ঝরে পড়তেই বীজতলায় ফুটে ওঠে তাদের নামের নকশা। দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
মিনু এগিয়ে এসে বলে, দেখো আমার পা কত পরিষ্কার হয়েছে!
শামীম অপলক তাকিয়ে থাকে। শিশিরে ধোয়া পা যেন সকালের প্রথম আলোকরেখা, কোমল, স্বচ্ছ, মোহনীয় ও অপার্থিব।
চল সামনে যাই পা সরিয়ে বলে, মিনু।
বকের সারি এখনো মাঠে নামে নাই। রাখালের গরুর পালও আসেনি। সবুজ মাঠ আর ভেরের সজীবতা শুধুই তাদের।
আবার দৌড়। ভেজা পা বাতাসে দোল খায়। তাদের আনন্দ ছড়িয়ে যায় চারিদিকে। সড়কে পেড়িয়ে দু’জন হাঁপাতে হাঁপাতে কাঠের পুলে উঠে। পুলের নিচে খাল। শান্ত, স্থির, ঘুম ঘুম। খালের ওপারে কুয়াশার ভাঁজে লুকিয়ে বিশাল তিতাস নদী।
শামীম তাকিয়ে বলে, দেখো। নদী কত সুন্দর!
কৃত্রিম অভিমান করে মিনু বলে, তোমার পাশে বসে আছি আমি! তাও নদীকেই সুন্দর লাগছে?
শামীম হাসে। তাকে জড়িয়ে ধরে। কপালে চুমু দিয়ে বলে, তোমার মতো সুন্দর কিছু পৃথিবীতে নেই। তিতাসও না। কোনো নদীও না।
মিনুর মন গলে যায় নদীর পানির মতো।
চল, তোমার সুন্দরী তিতাস নদী দেখে আসি। মিনু বলে।
দুষ্টু বুদ্ধি খেলে শামীমের মাথায়।
সে বলে, না। নদী দেখব না। তোমাকে দেখব।
অপ্রস্তুত হয়ে যায় মিনু। নিজকে সামলে নিয়ে বলে, দেখাচ্ছি তবে।
পুল থেকে লাফিয়ে খালপাড় দিয়ে নদীর দিকে দৌড় দেয় শামীম। সুখ সুখ ভাব নিয়ে তার পিছু নেয় মিনু।
আঁকাবাকা পথ পেড়িয়ে তিতাস পাড়ে চলে আসে তারা। তিতাসের বালুময় তীরে পৌঁছাতেই দূরে দেখা যায় জেলেদের জাল টানা। নদীর উপরে শুশুকের উঁকি দেওয়া। নৌকার ভেসে চলা।
আকাশ থেকে একে একে নেমে আসা সাদা বকের দল।
শামীম মিনুকে ধরতে চাইলে মিনু হাসতে হাসতে সরে গিয়ে বলে, আস, সুন্দরী তিতাশের পানিতে অবগাহন করি।
বলেই সে নদীর ধারে পানিতে নামে।
হতাশ হলেও মিনুর আকর্ষণে শামীমও নামে। ঠান্ডা পানির ছোঁয়া তাদের শরীরে শিহরণ তুলে সজীবতা বাড়িয়ে দেয়।
একটু এগিয়ে পরিষ্কার পানি মুখে ছিটিয়ে শামীমের দিকে তাকায় মিনু।
শামীম হাটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ভোরের আলোর মতো স্থির হয়ে আছে। মিনু ধীরে ধীরে তার কাছে যায়। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শামীমকে। শামীম পাশ ফিরলে তার মুখ মিনুর মুখের সামনে চলে আসে। মিনু মুখ তুলে তাকায় শামীমের চোখে। তিতাস নদী থেকেও অনেক উজ্জ্বল, মনোরম ও গভীর শামীমের চোখ। যে চোখে অনায়াসে ডুবে যাওয়া যায়।
হঠাৎ মিনু তার ঠোঁট রাখে শামীমের সিক্ত ঠোঁটে।
ভোরের আলো, শিশির, নদী, বাতাস সব মিলেমিশে ছুটে চলে নিজস্ব গতিতে। বকের দল উড়াল দেয় আকাশে। শামীম নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েও পারেনি। সমর্পিত হয় মিনুর কাছে। শিশির মোড়ানো পথ, কুয়াশা ভেদ করে হাঁটা, নদীর পানি তাদের শরীর ভেজাতে না পারলেও এক চুমুতেই ভিজে যায় তারা।
নিজের অজান্তে শামীমকে ধাক্কা দিয়ে নদী থেকে উঠে আসে মিনু। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠে। মনের ঝড় থামছে না কিছুতেই। পিছনে না তাকিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ে চলতে শুরু করে সে। তার লজ্জা, আনন্দ, ভালোলাগা ও ভালোবাসার মায়া কেউ যেন দেখতে না পায়।
বেশিদূর যেতে পারে না মিনু। শামীম তার সমানে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, কি হয়েছে! এভাবে দৌড়াচ্ছ কেন?
মিনু কিছু বলতে পারে না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শামীমের চোখের দিকে। শামীম চোখ
নামিয়ে বলে, চল বাড়ী যাই।
চলার পথে মিনুকে থামিয়ে শামীম বলে, নিশ্চয়ই ক্ষিদে লেগেছে? ঝাল খাবে না মিষ্টি খাবে? শামীমের কথা শুনে হেসে উঠে মিনু।
অবাক হওয়ার কিছু নেই। বলেই দেখ।
মিনু বলে, ঝাল।
ঠিক আছে। তাহলে আমি মিষ্টি।
পাশের জমিতে ঢুকে যায় শামীম। জমি থেকে মিষ্টি আলু এবং অপর জমি থেকে মূলা তুলে খালের পানিতে ধুয়ে নিয়ে মিনুর সামনে হাজির।
শামীমের করিৎকর্মে হেসে উঠে মিনু। তার হাসিতে হাজার পাখি উড়ে চলে৷ কুয়াশা শেষে সূর্যের দেখা মিলে। চারপাশের সবুজ আরো সবুজ হয়ে উঠে।
মিনুর একহাতে আলু দিয়ে অন্য হাত ধরে তারা আবার কাঠের পুলের উপর বসে। সুখী ও তৃপ্ত মনে ঝাল আর মিষ্টি খেতে খেতে আগামীর বীজ বুনে।
কুয়াশা কাটতে কাটতে সূর্য ওপারে উঠে এলে মিনু ধীরে ধীরে শামীমের আরো কাছে এগিয়ে আসে। তার হাতে আধখাওয়া মিষ্টি আলু। শামীমের দিকে
তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, এই ভোরের কথা, শিশিরের কথা, ভিজে যাওয়ার কথা তোমার মনে থাকবে?
শামীম একটু হেসে বলে, ভোর তো প্রতিদিন আসবে। তবে আজকের মত আসবে না কখনো।
মিনু চোখ নামিয়ে নেয়। বাতাসে তার চুল উড়ে শামীমের গালে ছুঁয়ে দেয়।
মিনুর কানের কাছে মুখ নিয়ে শামীম বলে, আজ থেকে আমরা আমাদের ভাবনাগুলো একসাথে ভাবব।
মিনু, চোখ নাচিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
কুয়াশা ভেদ করে তিতাস নদীর পানির ওপর
সূর্যের নরম আলো তখন রাঙা হয়ে নে
মুহাম্মদ ফজলুল হক
কথাসাহিত্যিক
শিক্ষক, ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজ
ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, বাংলাদেশ।