শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা। স্বপঞ্জয় চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা।

Spread the love

শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা

স্বপঞ্জয় চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা

শব্দকুঞ্জ কুয়াশাচ্ছন্ন শৈশব সংখ্যা

স্বপঞ্জয় চৌধুরী’র একগুচ্ছ কবিতা

প্রতিবেশি

এই শহরে জীবিত ও মৃতরা পাশাপাশি থাকে,

একসাথে হাঁটে, খায়, ঘুমায়।

প্রতিটি জীবিতের ভেতর একটি করে মৃত ঘুমায়

জীবিতরা ঘুমিয়ে পড়লে মৃতরা জেগে ওঠে

রাত বাড়ে পেন্ডুলামের কাটার শব্দ

আরও ঘনীভূত হয়,

ওদের ডেকোনা ওরা ঘুমোচ্ছে ওদের ঘুমোতে দাও,

আজন্ম ঘুমকাতুরে এই জীবিতদের শহরে

মৃতমুখগুলো উজ্জ্বল হচ্ছে মূলত তারা প্রতিবেশি

একে অপরের অপরিচিত

একটা নদী বইছে

শান্ত বিকেলের গোধূলির অভিমুখে

এই নদী থেকে কেউ পান করছে জল

কেউ পান করছে নহর,

কেউ হাসছে কল্লোলিত নদীর মতো

কেউ কাঁদছে গহীন সমুদ্রের মতো

মানুষ মূলত মৃত

জীবিতের ভান করে এই সমুদ্র শহরে

একে অপরের প্রতিবেশি হয়ে বেঁচে থাকে।

ঝলমলে বৃষ্টিফোটা

আমাদের ছোট্ট একটি ঘর

বাইরে তুমুল বৃষ্টি

জানালার রেলিংয়ে বসে আছে

ছোট্ট একটা পালক ভেজা শালিক

তার কাছে গেলেও সে উড়ে যাচ্ছেনা

শালিক ভালোবাসা বোঝে,

           আমার বুকের ওপরে তুমি

           গুটিসুটি হয়ে শুনছো বৃষ্টির গান

                       একটু অদূরে কলাগাছের পাতাগুচ্ছ

হেলেদুলে নেচে উঠছে ঝড়ো হাওয়ায়

তুমি বৃষ্টি ছোবে বলে জানালায় হাত বাড়াও

তোমাকে বৃষ্টি ছোয়, আমি ছুঁই তোমায়

                              তুমিই আমার বৃষ্টি,

আমাকে ভেজাও, হাসাও, কাঁদাও, ভাবাও

জল বাড়ছে, ঘরের ভেতরে জল

আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি

আমাদের পিঠের নিচে জলের নাচন

শাপের পেটের মতো হিম শীতল কোমলতা ছড়াচ্ছে

অতঃপর বৃষ্টি থামে,

আমার উঠোনে তুমি নেই

কাদায় ভেসে উঠছে তোমার পায়ের ছাপ

তুমি এসেছিলে বুঝি কাল বৃষ্টি হয়ে;

আমাকে ভেজাতে কেন আসো বারবার

এই ছোট্ট ঘরে ভেজা শালিকে বেশে।

উত্তরীয় উত্তর

আমরা তোমাকে এক বন্ধা ঋতু আখ্যায়িত করেছিলাম

তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিলাম কাউনের ক্ষেত,        

                       আধাপাকা ভুট্টা ও চালতার বন

সেই থেকে তুমি বিরোহী অনুজের মতো

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কুয়াশা ছড়াও

                          কেরোসিন ফুড়ায়, ধোঁয়া ওড়ে

বাতাসের ক্রোমিয়ামে চঞ্চল হয়ে উঠে হলুদের হুলিয়া

দূরের বঁধূয়া কুয়াশাক্রান্ত গাঙের ওপাশে

                             মায়ের ছবি খোঁজে।

ধীবরের নৌকোয় ঘুমোচ্ছে শেষরাতে ধৃত হওয়া পোয়া, ফ্লাইং ফিস,

জলকাতুরে মৎসজীবীর দল উদোম মাছের মতো

গোল হয়ে হুক্কা ফুকায়, শরীরে তেজ চাই

উত্তরীর উত্তরে তারা হামেশাই নিরুত্তর থাকে

মোজাইক শীতল গৃহসুখে পা’মোজার গন্ধ বিকোচ্ছে

                    আর শিশিরের ফাঁক গলিয়ে ছুটে আসছে

চির শীতলের দেহ থেকে একগুচ্ছ শর্ষে ফুলের ঘ্রাণ।

তথাপি শীতের সকাল

বাথট্যাবে উড়ছে হিমেল ধোঁয়া

একখন্ড সমুদ্র যেন হামলে পড়ছে উদোম দেহে

রতিক্রিয়া সম্পন্ন করে একটা শুশুক

দূরে ডুব দিতে দিতে চলে যাচ্ছে

একটু দূরে তোমার হাত, মুখমণ্ডল

হাতড়েও নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না

আমার দিকে তেড়ে আসছে এন্টারটিকা

তোমার দিকে বঙ্গোপসাগর

দুজনের দিকেই তেড়ে আসছে মিহি মিহি শীত

ভালোবাসার উঞ্চ বস্ত্রে ঢাকা পড়ছে আলো

 

তথাপি জেগে উঠছে শীতের সকাল।

স্বপঞ্জয় চৌধুরী। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবিন্ধক ও অনুবাদক। পেশা: সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সাউথ পয়েন্ট কলেজ। ইতিপূর্বে কাজ করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এ্যসিসট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর পদে। প্রকাশিত গ্রন্থ: ১৬। কাব্যগ্রন্থ: পতঙ্গ বিলাসী রাষ্ট্রপ্রেম, কালযাত্রার স্নিগ্ধ ফসিল, দ্রোহ কিংবা পোড়ো নদীর স্রোত, গহিনে অরন্য নদী, তৃষিত ঘুমের পেয়ালা, মায়ের মতো পরি (কিশোরকাব্য)। গল্পগ্রন্থ: জলপিপিদের বসতবাড়ি, ডুবেছিল চাঁদ নিশিন্দা বনে, মৃৎচক্রের দিনগুলি। উপন্যাস: ধান ফুলের গন্ধ (প্রকাশিতব্য)। প্রবন্ধ: নিগূঢ় শিল্পের কথাচিত্র, নিভৃত ভাবনার জলযান, চিন্তকের খসড়া খাতা। অনুবাদ: ভিন পাখিদের স্বর (কাব্য), সাইকোলজি অফ মানি (মূল: মরগান হাউজেল)। সম্পাদনা: International Anthology of Poetry for Peace and Humanity. সম্পাদক: শিল্পসাহিত্যের ওয়েব পত্রিকা শব্দকুঞ্জ।

স্বপঞ্জয় চৌধুরী
কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top