শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬। ওবায়েদ আকাশ এর একগুচ্ছ কবিতা

Spread the love

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

ওবায়েদ আকাশ এর একগুচ্ছ কবিতা

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

 

ওবায়েদ আকাশ এর একগুচ্ছ কবিতা

 

চেরাগের জীবন

 

তোমার আমার মধ্যে কখনো

পাঁচ হাজার মাইলের দূরত্ব ঘটতে দেখিনি

 

সর্বোচ্চ দশ থেকে বিশ মাইলের মধ্যেই

তোমার আনুমানিক তিরিশ আর

আমার চার বছরের জীবনে কী প্রগাঢ় বোঝাপড়া ছিলো

 

আজকাল দেয়াল থেকে দেয়ালে মার্বেল ছুঁড়ে মারি

অবিকল ফিরে আসে তারা হাতের মুঠোয়

আর ঈশ্বর প্রকাণ্ড ক্ষমতাবান বলে

তার ছুঁড়ে দেয়া তারা আকাশে নক্ষত্র হয়ে যায়

 

কিন্তু কখনো ফেরে না আর হাতের মুঠোয়

 

তোমার বুকে ঘুমিয়ে

আমি কি কখনো ঈশ্বর হতে চেয়েছি মা?

 

তবে কেন জীবন থেকে জীবনের ওপারে

ঝড়ের কবলে এক নিবু নিবু চেরাগের জীবন!

 

অক্ষরেরা উড়ে উড়ে পাখি

 

কবিতায় পদ্য মেশাতে গিয়ে যে লোকটি ধরা পড়ে গেল

দীর্ঘকাল ধরে তাকে আর দেখাই গেলো না

 

অথচ তার স্ত্রী বলছে, লোকটি ভালো মানুষের মতো ছিলো!

কন্যা বলছে, বাবার হাত যেন চন্দ্র-সূর্যের স্রষ্টা!

আর প্রতিবেশি একদল পুরুষ:

যাদের কারো উঁচু বুক, লম্বা চুল, শার্ট ও কামিজের মাঝামাঝি পরিধেয় পরে

প্রতিদিনের মীমাংসা ঘটান

শুধু তারাই লোকটির প্রতিপক্ষ আজ!

 

সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যারা

মধ্যরাতে লোকটির কাছে খাবার পৌঁছে দেয়

তাদেরও আছে লোকলজ্জা, পুলিশের ভয়

 

একদিন আমি নিশি রাইতে তাদের সঙ্গী হতে চাইলে

এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে আমাকে বলে:

ঘুমের সঙ্গে রাত্রি কিংবা দিনের সঙ্গে নিদ মেশানোর দায়ে

ধরা পড়ে যাবেন! মেনে নিতে হবে নির্বাসন!

 

এসব কথার আগামাথা না বুঝেই আমি দু’পাশে তাকিয়ে দেখি:

একদিকে জীবনানন্দ দাশ আর অন্যদিকে শক্তিদার মুখ

কেমন নির্ভার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

 

আমারও দুঃসাহস বাড়ে

তাদের পিছে পিছে মধ্যরাতে ধরাপড়া লোকটির কাছে যাই

আমাকে দেখেই লোকটি হোহ হোহ করে প্রাণ খুলে হাসে, হাসে

এবং কাশে

আর আমি তাকে বলি:

 

তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী!

 

মায়ের পদচ্ছাপ

 

অজস্র আলপিন ছড়িয়ে দিয়ে

একখণ্ড চুম্বক নিয়ে বসে আছি

 

অথচ আমার সারা দেহে বিঁধে গেল সমস্ত আলপিন

 

আমার চুম্বক খণ্ড কোথাও হারিয়ে ফেলেছি বলে

ভ্রম হতে না হতেই

আলপিনের ভাস্কর্য হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন মা

 

আর চারদিকে রাশি রাশি ছড়ানো চুম্বক

কুড়াতে গিয়ে দেখি

মায়ের ভাস্কর্য কখন উড়ে গেছে দূরে

 

ভূমিতে গড়িয়ে যাচ্ছে রক্তের ধারা

 

পৃথিবীর ক্লান্তিকর ঘুমে এলিয়ে দিলাম দেহ

আর ভোরে উঠে দেখি

রক্ত নদী ধুয়েমুছে জেগে আছে মায়ের পদচ্ছাপ

 

সম্পর্কের রক্তপাতজুড়ে

 

আজ থেকে ষোলো কোটি বছর আগে

আমি ঠিক হাতপাখার মতো ছিলাম

 

আমাদের মুকুল নন্দী, সে ছিলো আমার প্রেমিকা

যখন তখন তার হাতে উঠে যেতাম

জ্যৈষ্ঠ মাসের সিঁদুরে গরমে তাকে শীতল করে ছাড়তাম!

 

আর সে ঘুমিয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে

সারাঘর চিৎকার করে ব্যক্তিগত অসহায়ত্ব আগুনে পোড়াতাম

দগ্ধ হতে হতে ছাইভস্ম ভেসে যেতাম সিন্ধু-সলিলে

আর প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম তার সমুদ্র ভ্রমণের!

 

আজকাল একে অপরকে আর চিনি না পরস্পর

ঠিক চিনে উঠবার আগেই একজন পুরুষ আর একজন নারী হয়ে উঠি

সমস্ত শরীরে গজিয়ে ওঠে কয়েক লক্ষ নখ

পুরুষতান্ত্রিক প্রভুত্ব আর নারীবাদী জিঘাংসা

 

এক কোটি বছর অগেও আমরা ঠিক চেনা-না-চেনার মাঝামাঝি ছিলাম

এবং

মাত্র এক লক্ষ বছর পর

পরস্পর চুমু খেতে যাবার অভিলাষজুড়ে

চড়ে বসবে প্রাচীন ক্যাকটাস কিংবা নাগকেশরের ব্যাকুল রক্তপাত! 

 

শীতের প্রতারণা

 

শেষবার মায়ের কাছে গিয়ে বলি:

অন্তত এবার তো ওঠো মা!

 

শোনা যায়, শীতার্ত মাঘের আকাশে

বজ্রপাতে কতিপয় মৃতের সংবাদ

 

বলি, এতো এতো গ্রহ-নক্ষত্র

রাত্রি-দিন, পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য

তোমাকে কোথায় লুকাবে তারা!

 

দক্ষিণের আথালে গরুটির রোদন

পুবের খাঁচায় মুরগির আর্তনাদ থামাতে গেলে

 

কোথাও অদৃশ্য হয়ে যান মা

 

বাড়িময় ঋতুচক্র হয়

প্রতিবার শীতকাল এলে থেমে থেমে

রচনা করি হাহাকার!

 

শরতে কাশেরা ফুটলো

ফাগুনে দখিনা এলো

বুকভরা ওম নিয়ে আর কোনো মাঘে

 

নিরেট পূর্ণতা এলো না মা  

ওবায়েদ আকাশের জন্ম : ১৩ জুন ১৯৭৩; সুলতানপুর, রাজবাড়ী।

 একাডেমিক পড়াশোনা : বাংলা ভাষা  সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
পেশা : গণমাধ্যমে চাকরি। বর্তমান কর্মস্থল : দৈনিক সংবাদ। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা :
কবিতা, অনুবাদ, গল্প, প্রবন্ধ, সম্পাদনা মিলিয়ে ৩৭টি।

কাব্যগ্রন্থ: পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (২০০৩), দুরারোগ্য 

বাড়ি (২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (২০০৬), তারপরে, 

তারকার হাসি (২০০৭), শীতের প্রকার (২০০৮), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (২০০৯), যা কিছু 

সবুজ, সঙ্কেতময় (২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (২০১১), শুশ্রূষার বিপরীতে (২০১১), রঙ 

করা দুঃখের তাঁবু (২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (একটি দীর্ঘ কবিতা, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ 

(কয়েকটি দীর্ঘ কবিতা, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (২০১৪, কলকাতা), ৯৯ নতুন কবিতা 

(২০১৪), পাতাগুলি আলো (২০১৬), তথ্যসূত্র পেরুলেই সরোবর (২০১৮), সর্বনামের সুখদুঃখ 

(২০১৯) এবং পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর (২০২০)

কাব্য সংকলন:
ঋতুভেদে, পালকের মনোবৃত্তিগুলি (কাব্য সংকলন, ২০০৯), স্বতন্ত্র ৬০টি কবিতা 

(কাব্য সংকলন, ২০১০), ওবায়েদ আকাশের কবিতা  আদি পর্ব (কাব্য সংকলন, ২০১১), 

উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল (বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), মৌলিক

 পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি (কাব্য সংকলন, ২০১৭, কলকাতা), বাছাই কবিতা

(২০১১থেকে২০১৮ পর্যন্ত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৮), স্বতন্ত্র কবিতা (স্বতন্ত্র 

কাব্যসংকলন, ২০১৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (কলকাতা, ২০১৯)

Translated Book (Poetry Collection)
Faux Assassin
Translated by : Ashoke Kar, Haikal Hashmi, Mahfuz Al-Hossain, Razia Sultana and
Kamrul Hasan. (2019)

শিশুতোষ গ্রন্থ : ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ, ২০১৯

অনুবাদ:
ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্রুতি বহন করে না’ (২০০৯)
জাপানি প্রেমের কবিতা / এমন কাউকে ভালোবাসো যে তোমাকে বাসে না’ (২০১৪)

গদ্যগ্রন্থ :
ঘাসের রেস্তরাঁ’ (২০০৮),
লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (২০১২)

সম্পাদনা গ্রন্থ :
দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা’ (২০১২),
পাঁচ দশকে বাংলাদেশ : সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজভাবনা (বিশিষ্ট কবি লেখক বুদ্ধিজীবীর 

সাক্ষাৎকার সংকলন, ২০১৮),

সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন :
শালুক (১৯৯৯–)

পুরস্কার :
এইচএসবিসি–কালি  কলম তরুণ কবি  লেখক পুরস্কার ২০০৮
কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি  গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯
লন্ডন থেকে প্রাপ্ত সংহতি লিটারারি সোসাইটি বিশেষ সম্মাননা ২০১২
কলকাতা থেকে ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা পদক ২০১৬

যোগাযোগ:

 

email : oakash1971@gmail.com

ওবায়েদ আকাশ
কবি ও সম্পাদক, শালুক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top