শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গোলাম কিবরিয়া পিনু’র একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
গোলাম কিবরিয়া পিনু’র একগুচ্ছ কবিতা
নগ্ন সুন্দরতা
চরম আকুলিবিকুলিতে
কঠিন ও তপ্ত শিলার পাহাড়ে
তুমি ঝর্না তৈরি করে
মুহূর্তেই সেই জলে অবগাহন করে
ঝুলনপূর্ণিমা নিয়ে
বিভাবরী হয়ে উঠলে!
আমি তাতে মগ্ন হলাম–নগ্ন হলো সুন্দরতা!
এরপর ঘষিয়া মাজিয়া
সকল বিভাষা হয়ে উঠল,
আমাদের প্রমিত ভাষা!
র ম্যাটারিয়ালস হয়ে উঠল
ওয়েল ফার্নিস্ট ফার্নিচার;
তেমনি আদ্যভাষা হয়ে ওঠে গান!
মান রাখার যতই চেষ্টা করি
আদ্যবাদ্য শুনে
নিধুবনে নিদ্রাবিলাসীরও নিদ্রা ভঙ্গ হয়!
আমি কোন ছার–
আমি তো অল্প আগুনে ছারখার!
শশীকলা
শশীকলা!
তোমার উদ্ভাসে উদ্দীপিত হই!
তোমার আলোসংকেত পেয়ে
অন্ধকার গুহা থেকে বের হই!
আমার রাস্তায় বসানো হয়নি এখনো
বিদ্যুতের খুঁটি!
শিথানেও নেই আলো
আলোর দুর্ভিক্ষে দিন কাটাতে কাটাতে
চৈত্রের খরতাপ নিয়ে
অবসন্ন হয়ে আছি!
এবার শরতে
তোমার দেখা পাবো বলে
সন্দেহবন্ধন ছিঁড়ে ফেলে
পা রাখছি সামনে।
এইবার সন্দেশ মুখে তুলে দিয়ে
নতুন সন্দেশ জানাতে পারবো
ও আমার সেবন্তী!
তাতে তুমিও ফুটফুটে হয়ে উঠবে!
রাত্রিমণি
ও রাত্রিমণি–
এই নিশুতিরাতে–
তোমার বিদ্যুৎপ্রভায়
আমি প্রজ্জ্বলিত হই,
পরিস্ফুট হই,
প্রহেলিকা থাকে না–
যেন প্রাইভেট টুইশনি চুকিয়ে
তোমাকে মুখস্থ করতে এসেছি।
তুমিও এক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান
ইঙ্গিতে ইঙ্গিতে কত চিহ্ন নিয়ে আছো
এই প্রকৃতির মাঝে,
তোমার বইয়ের পৃষ্ঠা খুলে ধরো
এখন শুধু পড়তে চাই!
তোমার প্রচ্ছদ দেখে শুধু মুগ্ধ হইনি–
আভা ও দ্যুতির অভিকর্ষে
তোমার কক্ষপথে চলে এসেছি,
আমার চৈতন্য ও শোণিতে এখন
– বিদ্যুৎঘূর্ণি!
মধুবনে বৃষ্টি
মধুবনে বৃষ্টি!
শূঁয়োপোকা ভিজে যায়
রাজহাঁসও ভিজে যায়!
আমিও ভিজতে ভিজতে
অশ^শক্তি নিয়ে
আস্তাবলে মৃতপ্রায় হয়ে
পড়ে থাকতে পারি না!
প্লাবনের ডাক শুনি
সেবন্তীও ডাকে!
বৃষ্টির কানাঘুষো নেই–কানাগলি নেই
উদার আকাশ থেকে ঝরে,
পুনর্জন্মের গজল শোনায়
আমি তা শুনবো না!
ক্রোশ ক্রোশ জমি হয় জলমগ্ন–
নগ্ন হয়ে ওঠে জলের প্রান্তর,
খিড়কিপুকুরের খিড়কি খুলে যায়!
আমি আমার দরোজা খুলবো না?
পাপিয়া
পাপপুরীতে পাপিয়া বন্দী হয়ে আছে!
ডানা ঝাপটাচ্ছে!
তবুও কেউ তাকে উদ্ধার করছে না!
পুরাকাল থেকে এখনকার পাপ
পুঞ্জীভূত হচ্ছে!
লোকেরা করতাল ও পাখোয়াজের সাথে
পুরিয়াধানশ্রী শুনেও–
আত্মরতিতে চৈতন্যহীন হয়ে পড়ছে!
কেউ বন্ধ দুয়ার খোলার চেষ্টা করছে না,
বরং দরোজায় আরও পেরেক মারতে
–সহায়তা করছে!
এলো কী কাল? ফাল মারছে এখন!
প্রণয়তৃষ্ণার বদলে প্রণয়বিকার নিয়ে
প্রত্ন আবিষ্কার করতে গিয়ে
নিজেরাই প্রত্নশীলা হয়ে পড়ছে!
ভূগোল ও ইতিহাসে আত্মদর্শন
–পুনর্গঠিত হচ্ছে না,
নতুন পোশাক পরেও পাপাচার!
পাপিয়া তো নন্দনকাননেও বন্দী থাকছে!
গোলাম কিবরিয়া পিনু , মূলত কবি। প্রবন্ধ, ছড়া ও অন্যান্য লেখাও লিখে থাকেন। গবেষণামূলক কাজেও যুক্ত। গোলাম কিবরিয়া পিনু-এর জন্ম ১৬ চৈত্র ১৩৬২ : ৩০মার্চ ১৯৫৬ গাইবান্ধায়। গাইবান্ধা শহরে মূলত শৈশব-কৈশোর কেটেছে। পড়েছেন গাইবান্ধা শহরের মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এর পর মাধ্যমিকÑগাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে, এর পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা : স্নাতক সম্মান (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) এবং স্নাতকোত্তর; পিএইচ.ডি. । ১৯৮৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে ঢাকায় বসবাস করেন। লিখছেন তিন দশকের অধিককাল। এর মধ্যে কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলে ২৬টি গ্রন্থ বের হয়েছে–বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। বিশ্ববাংলা কবিতা, উত্তম দাশ, মহাদিগন্ত, কলকাতা, ২০১৩, পৃষ্ঠা-১৪৩ কবিতার বই ছাড়াও তাঁর ছড়ার কটি বই আছে। আছে বাংলা নারীলেখকদের নিয়ে গবেষণা গ্রন্থ, যা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠা থেকে নারী লেখকদের সৃজনশীলতা ও বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবদান বিশেষভাবে এসেছে। নারী লেখকদের সাহিত্য-ভূমিকা, সৃজনশীলতা, জীবনচেতনা, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ভূমিকার বিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে । এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে প্রবন্ধের বইও রয়েছে। শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর-সহ ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর রয়েছে ভূমিকা। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রতিবাদ-কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গাইবান্ধায় অনুষ্ঠিত প্রথম ছাত্র মিছিলে নেতৃত্ব দান, ১৯৭৫-৭৭ পর্যন্ত হুলিয়া ও গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সে-সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কবিতা লেখা ও তা ‘সাপ্তাহিক মুক্তিবাণীসহ অন্যান্য সংকলনে ছাপা। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ও ধর্মান্ধ-মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য ও এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ-এর সদস্য। এখনো কটি সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। পেশাগত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, বলিভিয়া, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ পর্যন্ত একটি আর্ন্তজাতিক মিডিয়া বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’-এর সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন। এর আগে এফপিএবিতে উপপরিচালক (এডভোকেসি), ফোকাল পয়েন্ট ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া এফপিএবি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘সুখী পরিবার’-এর সম্পাদক হিসেবে ১৯৮৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিসিসিপি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যুক্ত ছিলেন। পেশাগতভাবে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, কলামলেখা, সম্পাদনা ও এডভোকেসি বিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছেন।