শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
বদরুজ্জামান আলমগীর এর
একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
বদরুজ্জামান আলমগীর এর একগুচ্ছ কবিতা
তারায় তারায়
আগে জানতাম না এটি গাছ
মনে হতো এ কেবল এক ছায়া প্রদায়িনী বিস্তার
যেই সন্ধ্যার আলোয়ানের ভিতর একঝাঁক
পাখি উড়ে চলে যায়- তখনই আমাদের সামনে
একটি গাছকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।
ভেবেছিলাম চোখের সামনে এ স্টিমার স্টেশন
পাশে রাখা কাছি ও বিক্ষিপ্ত দড়াদড়ি
এ কেবই দূর থেকে আসা নৌকো
আন পাড় থেকে জল কেটে আসা লঞ্চ বেঁধে
রাখার একহারা আশ্রম
কাঠুরে এসে কাঠ কেটে নেবার পর যখনই দেখি
কাটা ক্ষরণ থেকে পুঁই, মুকুল, একটি ফুল
বেরুবার জন্য একটি জৈব বেদনা গঠিত হয়ে ওঠে
তখনই বুঝি এ ঘাট নয়- এ যে এক দুঃখ পাওয়া গাছ
ছাদ ভেঙে গলগল জল গড়িয়ে পড়ার পর
আলগোছে আবার নীলের সামিয়ানায় বিন্যস্ত হয়ে ওঠে
তার নাম দিই অকাশ, আকাশ বলে ডাকি তারে
একমাত্র নীল নয়, নয় কেবল নীলের ভাসমান গিলাপ
তীব্র নিকষ অন্ধকার আরও ঘনীভূত হলে
দুনিয়ার এমাথা থেকে ওমাথা তারায় তারায়
ভরে যায়, দুঃখের দানাগুলো নক্ষত্রের মেলায় ভরে ওঠে
তখনই বুঝি- এ কেবল আকাশ ও রাত্রি নয়
এ তুমি, তুমি ছাড়া আর কে রাখে এতোটা সজল কানন
তুমি, এ যে তুমি।
প্রথম বৃক্ষরোপণ
মাছ বাজারে সরল তাজা জিয়ল মাছ খুঁজি
কিন্তু কী আশ্চর্য, নুয়ে দেখি ছুঁয়ে দেখি
কোন মাছটির কানকোর নিচে রক্ত জমে আছে
কে পরে আছে রক্তের নোলক
বড়শির কাঁটাও যে বাঁকা, হাঁপরে নোলক আঁকা।
হাসপাতাল আশা নিরাশার ডেন্ডিলায়ন
একজনমের মায়া মায়া ভুল,
হাতের রাঙা উত্তাপ আর কপালে জমে থাকা ঘাম
মন বাড়িয়ে কোদালে নিজেকে মাটিতে রুই
প্রণমি তোমায় বিরহে আমায় করো না নির্মূল।
স্টেশনে এলে দেখি, বারবার দেখি
সব যাত্রীর মুখে লেগে থাকে বিদায় বলার মেঘ
কারো চোখে জমা আছে রঙের হাওয়াই
মিলনের ফুটে থাকা আবীর, সুস্বাগতম।
সবার ভিতরে দূরাভিলাষী মানুষের ভিড়ে আমি
হোমলেস ভিখারি লোকটিকে খুঁজি-
যে এখনও এই নির্দয় প্রতিষ্ঠা কালে আমাকে
মনে করিয়ে দেয়-
আমারও বুকের ভিতর একমুঠো লেবুপাতা আছে,
পাখির পালকের উষ্ণ কুশিকাঁটায় তোলা আছে প্রাণ
ওখানে এস এম সুলতানের প্রথম মানুষ
একটি শস্যের চারা রুয়ে প্রতিদিন নাই হয়ে যায়।
ওয়াওয়া
কোন ওয়াওয়ার স্টল কাম গ্যাস স্টেশনে
ঘন্টায় সাড়ে চারশ গাড়ি পুল ইন পুল আউট করে
ওয়াওয়ার গ্যাস স্টেশনে মোটের উপর
ষোলটা গ্যাস পাম্প থাকে
ষোলটা পাম্প চব্বিশ ঘন্টা বিরতিহীন
মনে হয় ওয়াওয়ার গ্যাস লাইন মাটি ফুঁড়ে
রাশিয়া, বা ইরান বা কাতারের
তেল খনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে
তা না হলে এতো গ্যাস কোত্থেকে আসে?
গ্যাস পাম্পের পাশেই ওয়াওয়ার রকমারি দোকান
কী নাই সেখানে? চা, কফি, পানীয়, সেন্ডুইচ, বার্গার
মোটের উপর বেঁচেবর্তে থাকার জন্য, দৌড়ের উপর
গুলতানি মারার জন্য যা যা লাগে তার সবই আছে।
শত শত মানুষ আসে এখানে, হাজার হাজার
মানুষ আসে ওয়াওয়ার দোকানে
কিন্তু কেউ বেশিক্ষণ থাকে না, আসে আর যায়
হাজার হাজার গ্যালন গ্যাস এসে পাম্পে জমা হয়
শত শত গাড়ি নল লাগিয়ে গ্যাস নিয়ে চলে যায়
চকিতে মনে হয়, এটি একটি পাড়ার
গ্যাস স্টেশন মাত্র নয়- এ গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
কোটি কোটি লোক এসে অগুণতি প্রাণীকূল এসে
জমা হয়, কিন্তু কেউই বেশিক্ষণ থাকে না
চলে যায়, আসে আর চলে যায়।
ওয়াওয়ার এতো গ্যাস কোত্থেকে এসে জমা হয়
আমরা জানি না- দুনিয়ার এতো মানুষ এতো প্রাণ
কোত্থেকে আসে- আমরা জানি না
খুব গোলমাল বেঁধে যায়- দুনিয়া কী ওয়াওয়ার দোকান
না-কী ওয়াওয়া আসলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড?
বুঝি না, বুঝি না আসলে- গ্যাস নেয় কফি নেয়
একগোছা ফুল নেয়, কিন্তু কেউ বেশিক্ষণ থাকে না।
মেল্টিং ক্লক
আমার মনে হলো বিশ্বাসের উজাড়ে
জঙ্গলের ভিতরে একা ছিল এক শীর্ণ জলাভূমি
তার নাকে ফুটেছিল লাল পদ্মফুলের নাকফুল
পায়ে ঘুঙুর ছিল পানি সিঞ্চনের নূপুর ছিল-
এ যেন ম্যানহাটন নয়, নয় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার
আমার শৈশবের গুলতি- এ আমার জল
এ আমার পাথর, এ আমার জল বৃষ্টির গোড়ালি
আমি দুলতে থাকি বালুর পিঠ আঁকতে থাকি
পুড়তে থাকি আমি বরফে হিমে পুড়তে থাকি
বলি যে আমার জন্ম না হোক- আমি না জন্মাতে থাকি।
এতোগুলো মানুষ, এতোগুলো পোড়ামাটি বিদ্যুৎ
আমার সঙ্গে গলতে থাকে
ম্যানহাটনের টুইন টাউয়ারের স্মৃতি তিন হাজার
চোখের ভুরু, জামা ও আলো, বিলবোর্ড আর
কংক্রিটের নিচে জ্যাজ মিউজিক
আমার সাথে আমি, তাদের সাথে আমি গলতে থাকি
গলে গলে যাই, দুনিয়ায় আর কোন জন্মমৃত্যু নাই
আমরা সকলে সালভাদর ডালির মেল্টিং ক্লক গলে গলে যাই।
উপাসনাসমগ্র
আশায় বসতি মানুষ ফুলের কেন্দ্রীয় প্রণতি
আমার জন্মের পর আমার নাভি মায়ের নাভির সঙ্গে
একাকার ছিল- মায়ের শ্বাস থেকে আমারও শ্বাস হতো
আমাদের জীবনই শুরু হয় বিচ্ছেদের ওঙ্কার থেকে।
আজ যতোই ভাবি- আমার নাভি জননীর নাভির সনে
এক হতে পারে না আর।
তুমিও আমার জীবনে এমনই এক বনাঞ্চল
ওখানে ছায়া হয় মায়া হয় অন্তরীক্ষের সুবাস হয়
কেবল রাত্রিযাপন হয় না, হয় না বীজায়ন।
বেঁচে থাকার সবটুকু মধু ও টোটকা, স্তব্ধতা আর সাহস
তামাম ভেষজগুণ বনভূমি থেকে আসে
একাকার না হওয়া, পিছুটানের জ্যোৎস্না সুরের দানায়
গৃহাঙ্গনে তুলে আনা-ই অনাঘ্রাত মহিমা তোমার
এভাবেই তুমি জীবনভর আমার চাঁদের বীজানু বিভা।
কখনও ঠাণ্ডা ও গোলাকার চাঁদ নও আমার,
তুমি দূরত্বের হৃৎস্পন্দন , ঈশ্বরের অদেখা নুন,
জন্মেরও আগের হেরিটেজ, আমার উপাসনাসমগ্র।
বদরুজ্জামান আলমগীর: কবি, নাট্যকার, অনুবাদক।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর।
নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো। দূরত্বের সুফিয়ানা।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
ভাষান্তরিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
জালালউদ্দিন রুমির কবিতা, মসনবি : মোরাকাবা ও জলসংগ্রহ।
প্রকাশিতব্য সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা : পানপাত্রে নক্ষত্র কুচি।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
নাটক : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে। পুণ্যাহ। আবের পাঙখা লৈয়া। জুজুবুড়ি। চন্দ্রপুরাণ। পানিবালা। বাঘ। পরীগাঁও। ইলেকশন বাজারজাতকরণ কোম্পানি লিমিটেড। এক যে আছেন দুই হুজুর। পিঁয়াজ কাটার ইতিহাস। ডুফি কীর্তন। ভাসিয়া যায় লাল গেন্দাফুল।।