শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬। এলিজা খাতুন এর একগুচ্ছ কবিতা

Spread the love

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

গল্প: আরাধনা
এলিজা খাতুন

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

 

আরাধনা

এলিজা খাতুন

 

ঘন হয়ে আসছে গোধুলী। ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মের বাইরে এসে ইজিবাইকে উঠেছে আরাধ্য। অনেকদিন পর ফিরছে গ্রামে। চাচার বাড়ি। নদীর সমান্তরালে পিচপথ, প্রায় সাতাশ কিলোমিটার। সূর্য ডুবো ডুবো। মনে হচ্ছে নদীতে সূর্যটা ধীরে ধীরে গলে গলে মিশে যাচ্ছে ঢেউয়ের সাথে। সূর্যের রক্তিম আলো নদীর জলে মিলেমিশে যেন গলিত স্বর্ণপ্রবাহ! 

এই দৃশ্য চোখের পলকে হারাতে চায় না, ইজিবাইক ছেড়ে দেয় আরাধ্য। নদীসংলগ্ন পাড় ধরে এগোয়। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটাপথ। গাছগাছালির ফাঁকে অদূরে চোখ আটকে যায়। ওখানে কে মেয়েটি? মুখ চেনা চেনা! কাজরীর মতো লাগছে কি! হ্যাঁ ও’ই তো! আরাধ্যর চাচাতো বোন কাজরী। ছোটচাচা ছোটবেলা থেকে ওদের দু’বোনকে একসাথে ডাকতেন আরু-কাজর বলে। ডাকতেন আরাধনা বলেও।

আরাধনা পথ ছেড়ে নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়ায়। দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধরা পড়ে- ঘন ঝোপের পাশে দুজন মানব-মানবি, আসন্ন সন্ধ্যায় এই নির্জন ঘাটে কাজরীর পাশে বসা ছেলেটি কে! 

এটাকে বহুজনের স্নানের ঘাট বলা যাবে না। ছোট ডিঙ্গি নৌকা ভিড়তে পারে কেবল। আশপাশে উঁচু উঁচু ঘাসের ঝোঁপ। ওরা কি প্রায়ই আসে এখানে! আর এগোয় না আরাধনা। কাজরীকে ডাকবে! দ্বিধা-দোলাচলে নদীর বুকে গোধুলীর শুয়ে পড়া দৃশ্য আরাধ্যর চোখে হারায়। যদিও অস্পষ্ট ওদের কথা, ঝোপের ওপাশ থেকে ভেসে আসে কাজরীর কন্ঠ।

জানো সাজিদ, তোমার কাছে যতক্ষণ থাকি- সময় দৌড়ায়, আমাদের সময়গুলো আরেকটু দীর্ঘ হতে পারে না!

উঁহু! প্রকৃতির নিয়ম।দেখছো না দিন আর রাত যুক্ত হওয়ার মুহূর্ত কত ক্ষুদ্র! ঐ দেখ সূর্য ডোবা কী অভাবনীয় সুন্দর! অথচ গোধুলীর আয়ু কত ক্ষীণ! কাজরী আর সাজিদের মৃদুমন্দ আলাপ বাতাসের সেতারে ছন্দবদ্ধ সুর। এবার ফিরতে হবে, বলে কাজরী। 

সাজিদের উত্তর-

কাজরী, হামি কাইল গাঁ ছাড়্যা চল্যা যাছি ম্যালা দিনের মতন। চরে। নদীর প্যাটের ভিতরের মাটি মেশিন দিয়্যা উঠিয়্যা দূরে ডাঙায় ফ্যালে।ওখ্যান থাক্যা কোদালে কাট্যা কাট্যা সরাত্যে হব্যে। মাটি তো লয়, শুখাল্যে বালু। ট্রাকে তুল্যা শহরে পাঠায়। বাপু ওখ্যান্যে সরদারি পায়্যাছে। হামাকে লিয়্যা যাব্যে। হিসাব লেখার কামে ঢুকিয়্যা দিবে হামাকে। বালু-তোলা মহাজন কহ্যাছে বাপুকে।

আর তোমার লেখাপড়া! 

জানিন্যা। 

জানিন্যা কহিলে হব্যে না। হামাকে কথা দ্যাও, পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দিব্যা।আর কামের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা। তোমাকে যে বইগুলা দিয়্যাছিনু সেগুল্যা হামাকে ফেরত দিতে হব্যে না। সাথে লিয়্যা যাব্যা। হামি লতুন বই কিন্যা লিবো।

কাজরী সাজিদের হাত নিজের মাথায় ধরে প্রতিজ্ঞা করায়। তারপরে ঝোঁপের ওপাশের সরু রাস্তা ধরে কাজরী উঠতে থাকে পিচ রাস্তায়। সাজিদ অন্যপথে। 

নদীর তীর ছোঁয় শেষ আলো, চিকচিক করে বেলেমাটি।তীরে জল শুকানোর দাগ বাড়ে দিনে দিনে, বড় কাছের লাগে সরু হয়ে আসা নদীর এপার থেকে ওপারের সবকিছু। অথচ নিকট মানুষগুলোকে বোঝা যায় না, কাজরীকে এখানে এভাবে দেখবে, ভাবতেই পারেনি আরাধনা। নদীর কুলুকুলু শব্দ কীসের স্বাগত ধ্বনি!? আরাধ্যর দৃষ্টি আর মন দুর্ভাবনার অতলে, জলের নিচে সূর্যের প্রতিবিম্ব যেমন।

 

রাত্রে খাবার পর কাজরী আসে আরাধনার ঘরে। আরাধনা বলে- কেমন আছিস আজকাল? কাজরীর গলায় এক টুকরো বাতাস আটকে গেছে, শুকনো মুখ, নিরুত্তর। 

গম্ভীর স্বরে আরাধনা বলে- এমন কিছু কোরো না- যেন সমাজে চাচাজানকে হেয় হতে হয়। ধীর-নরম স্বরে কাজরী বলে- কাউকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া অন্যায়? 

-তোমার মাথায় রাখতে হবে যার স্থান হৃদয়ে, তাকে নড়বড়ে ভিতে ঠাঁই দেওয়ার ভাবনা নিছক বিড়ম্বনাময় দুঃখ। যা পরিপুষ্ট হয়ে ঐ হৃদয়কেই ক্ষতবিক্ষত করে জীবনভর। তোমাদের পড়াশোনা… 

-আরুদি, সাজিদ দরিদ্র পরিবারের হলেও সে একটা স্কলার। ক্লাসে সবসময়ই প্রথম তিনজনের মধ্যে থেকেছে।

-ওটা পুঁথিগত বিদ্যা। এটুকু বিদ্যেয় ভর করে কেউ কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত এমনকি সঠিক জীবন বেছে নিতে পারে না।

-কিন্তু দিদি, এটা তো ভুল নয় যে, ওর ট্যালেন্টটাই ওর ভবিষ্যৎ।

-এবার আসল পয়েন্টে এসেছো। ইচ্ছের মূল্য দিতেই ইচ্ছেকে সংযত করতে হয়। বিশাল একটা সময় আমাদের রাষ্ট্র আর সমাজ বেঁধে দিয়েছে ছেলেমেয়েদের জন্য। এ সময়ের মধ্যেই গড়ে নিতে হয়, নিজেদের কীভাবে কোন্ অবস্থানে দেখতে চায় তারা। দারিদ্র্য মানে কেবল অর্থের সংকট নয়। মানুষ হিসাবে কারো পূর্ণ সম্ভাবনার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারার ক্ষমতা না থাকা এক ধরণের দারিদ্র্য। শুনছো আমার কথা!

কাজরী ঘুমিয়ে পড়েছে, না-কি নিরবে চোখ বুঁজে- উন্মোচনের তাগিদ পায় না আরাধনা। ওর মাথার নিচে বালিশ দিয়ে লাইট অফ করে।  

গ্রামের সবকিছু ভালোলাগার কথা আরাধনার। এই যেমন ঘুম ভাঙার পর সকালের স্নিগ্ধতা। কিন্তু কেবল স্নিগ্ধতাই নয়, বিশাল জায়গা জুড়ে দোতলা বাড়িটাকে ঘিরে অদ্ভুত রকমের নিঃশব্দতা। বড় বাড়ি, বড় উঠোন, বড় বড় ঘর। আরাধনা আড়মোড়া ভেঙে উঠে দ্যাখে কাজরী নেই।

এত ভোরে কোথায় গেলো মেয়েটা! সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বাড়ির পরিচারিকাদের মুখে জানতে পারে- চাচাজান মানে আবেদ আলী চৌধুরী হাঁটতে বেরিয়েছেন। লতাগুল্ম নুয়ে পড়া সরু গলি ধরে বাড়ির পেছনপথে নদীর দিকে এগোয় আরাধনা।

নদীতীরে পৌঁছাতে আমবাগান ছাড়িয়ে আরো নেমে যেতে হবে ঢালু ভূঁই মাড়িয়ে। বাগানের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আরাধ্যর চোখে পড়ে- নদীর একেবারে তীর ছুঁয়ে যে জলের রেখা, ওখানেই কাজরী। আরাধ্য হালকা দৌড়ে নামে।

জলে পা ডুবিয়ে ¯্রােতে নিমগ্ন কাজরী। আরাধনা মাথায় হাত রাখতেই কাজরী ঘুরে তাকায়, ওর এমন চাহনী আর ফ্যাকাশে মুখ এই প্রথম দ্যাখে আরাধনা। পাশে বসে বলে- তোর কী হয়েছে বলতো কাজরী?

-কী বলবো? আরুদিদি বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত। 

-ভূমিকা না করে খুলে বল।

-আমার বন্ধু পুষ্পরাণি। গতকাল পুষ্পকে পথে একা পেয়ে কয়েকটা ছেলে শাসিয়েছে। ছেলেগুলো কুৎসিত ইঙ্গিত করেছে ওকে। আসলে ওদের বিরক্ত করা ব্যাপারটা আরো আগের। পুষ্পর বাবা পরিতোষ মুন্ডার ছোট্ট সেলুনের দোকান আছে বাজারে। ওতেই কোনোরকম চলে ওদের। আরুদিদি পুষ্প খুব কেঁদেছে গতকাল। 

-বাড়ি কোথায় মেয়েটার? একবার নিয়ে যাস তো আমাকে।

-উলু পাড়ায় ওদের ঘর। ঘর বলতে, চাঁচের বেড়ায় ঘেরা টিনের চালা। আমার পুরোনো জামাকাপড় সাবান শ্যাম্পু দিই মাঝেমধ্যে। একসাথে পড়ি। ওকে ছেঁড়াছুটো পরতে দেখে খারাপ লাগে। তুমি যদি যাও পুষ্পর মনটা ভালো হবে আরুদি। কিন্তু সমস্যা তো অন্যখানে।

-সবটা খুলে বলছিস না কেন?

-আরু’দি, পুষ্প যাদের নাম বলেছে- দু’একজনকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছি। অয়ন দাদার কাছে।  

-অয়নের সাথে ওরা কতটা ঘনিষ্ঠ? ব্যাপারটা তাহলে অন্যভাবে ভাবতে হবে। বাড়ি চল এখন।

কাজরী উঠে দাঁড়াতেই বড় নিঃশ্বাস বের হয় ফোঁস করে। দু’বোনের দুটো ছায়া দ্বিগুন আকারে হাঁটছে পাশাপাশি। ততক্ষণে রোদের নরম হাসি চরের বালুকে চকচকে করে তোলে।  

রাস্তায় অনেক মানুষ। একই দিকে যাচ্ছে। আরাধনা জিজ্ঞেস করে হঠাৎ এত মানুষ! কাজরী উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, উলু পাড়ার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। রাস্তায় ওঠার পর হন্তদন্ত ছুটে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে শোনা যায়- ব্যাবাক পুড়্যা ছাই হয়্যা গেছে। 

আরাধনা কাজরীর দিকে তাকায়। চোখাচোখি হতেই দুজনে রাস্তার মানুষদের সাথে মিশে এগোতে থাকে উলুপাড়ার দিকে। 

খানিক দীর্ঘ গ্রাম, তারপর নদীর বাঁক, সম্মুখে নৌকা সব মেশামিশি। অনেক দূর অবধি নতুন-পুরাতন ঘরগুলো গলাগলি। তারপর বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা, নিচু জমি। এখান থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গেছে নদীটা। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর আবার ঘনবসতি। গায়ে গায়ে লাগোয়া ঘরের চালা, টিনের চালা। উলুপাড়ার বেশিরভাগ ঝুপড়ি-চালার নিচে এরা অধিকাংশ জেলে, কিছু তাঁতি, কয়েক ঘর নাপিত। গোটা চল্লিশের মতো পরিবার। 

উলু পাড়ায় ঢুকে পড়েছে আরাধনা ও কাজরী। লোক সমাগম বাড়ছে। পথের ভিড়ে এগোনো মুশকিল। কাজরী ডানে বামে তাকায়। পুষ্পরাণিকে খুঁজছে। ভিড় ঠেলে আরো সামনে এগোতে থাকে ওরা। 

এ কী দৃশ্য! কাজরী পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে। এখানকার অবস্থা দেখে হতভম্ব আরাধনা। নিঃশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষণকাল। তারপর আরো এগোয়। একেবারে পোড়াভিটের কাছাকাছি। কোনো কোনো ঘরের সমস্ত কিছু কয়লায় রূপ নিয়েছে। 

নিজেদের পোড়া বিধ্ধস্ত ভিটেয় যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের দেখে মনে হচ্ছে ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আধপোড়া নিভন্ত কাঠ। মধ্যবয়স্ক একটা লোককে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আগুন লেগেছে শেষ রাতে। ইতোমধ্যে আগুন নিভে এসেছে, ঘরগুলোয় জল ঢেলেছে যারা, ওদের বর্ণনা শুনছে দর্শনার্থীরা। গায়ে গায়ে মিশে থাকা বিশ-পঁচিশটা ঘরকে চেটেপুটে নিয়েছে আগুনের জিহ্বা। দৃশ্যত আগুন নিভেছে বলা যাবে। যে আগুন জীবনের গভীর থেকে গভীরতর ক্ষত বাড়িয়ে চলেছে তা কী নিভেছে! 

 

গঞ্জ থেকে স্থানীয় দু’তিনজন রিপোর্টার এসেছে। অগ্নিকান্ড কীভাবে ঘটলো সে প্রশ্নের সঠিক উত্তরে পৌঁছানো এত দ্রুত সময়ের ব্যাপার নয় যদিও, সংবাদ শিরোনাম দিচ্ছে যে যার মতো। গ্রামে গজিয়ে ওঠা নব্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটরেরা ফোনে ধারণ করতে মেতে উঠেছে- পোড়া মুখ, পোড়া ঘর, পোড়া মাটি, পোড়া সময়। পুষ্পরাণী কাঁদতে কাঁদতে হাতের বাটি দেখিয়ে বলে-

এদ্দ্যা দ্যাখো টিফিন বাটিতে হামার বাপু কত টাকা জমিয়্যা থুয়্যাছে, হামার বিহ্যার লাগ্যা। হামার বাপু পুড়্যা গেছে টাকা বাঁচাত্যে যায়্যা।

পুষ্পরাণীর মা জীর্ণ আঁচল তুলে চোখ মুছতে মুছতে বলে, কত বারণ করনু পুষ্পর বাপুকে, উ হামার কথা কানে নিলে না, ধা ধা কর‌্যা ব্যাবাক ধর‌্যা গেছে, গনগনিয়্যা জ্বলছে ক্যাঁথা বালিশ, বাঁশে ঝুল্যা থাকা পিন্ধোনের কাপড়-চুপোড়, ঘরের চাল, শিঁক্যা, উরকম জ্বলন্ত আগুনে ধড়ধড় কর‌্যা ঢুক্যা গেলো মানুষটা। কহিছে- হামার বেটির বিহ্যার লাগ্যা জমানো টাকা হামি পুড়তে দিবো না। দুই মা-বেটিতে কত টানাহিঁচড়্যা করনু; নাহ, উ শুনলে না কাহোরি কথা। উ চল্যা গেল হামরাকে ভাসিয়্যা।

কথাগুলো শেষ করে পুষ্পর মা হু হু করে গলা ছেড়ে কাঁদে। আধপোড়া টিন, বেড়া, খুটির আশপাশে বিধ্বস্ত  পোড়াত্বকের শরীরগুলো ঘিরে ক্যামেরা তাক করে ছবি নিচ্ছে কেউ কেউ।

এ বিভৎস কান্ডের সুত্রপাত কী! এ প্রশ্ন অনেকেরই। উত্তরটা যে নিশ্চিত করে বলার নয় সবার জানা। এরই মধ্যে রিপোর্টারের ফোন-লাইভে “কাউকে সন্দেহ হয়?” -এমন প্রশ্নের মুখে এক তরুণ গড় গড় করে বলে, 

‘এঠে হামরা মিল্যামিশ্যা বাস করছি ম্যালাদিন থাক্যা।আগে কুনোদিন সমিস্যা হয়নি। এখন হামারঘে ভিতরে দাঙ্গা বাধাব্যার লাগ্যা এমন কাম কর‌্যাছে বাইরক্যার কেহ। মনে হছে বড়সড় দলবাজি করে- ইরকম কাহোরি হাত আছে।’

রিপোর্টার পাল্টা প্রশ্ন করে- ‘কার হাত আছে বলে মনে করেন’? 

তরুণ ছেলেটি বলে, ‘কারা ষড়যন্ত্র কর‌্যাছে, কেনে কর‌্যাছে সেট্যা ঢুঁড়্যা বাহির করা আপনারঘে কাম, হামরা কেমুন কর‌্যা কহোবো’? 

রিপোর্টার নাম জানতে চাইলে ছেলেটি বলে, হামার নাম সুখেন পাল। রিপোর্টার সরে গেলেও সুখেনের মুখ থেকে ঘৃণাভরে উচ্চারিত হতে থাকে, ‘শালারা দরদ দেখাত্যে আইসছে, ওরাকে চিনতে পারলে কী করবে! মুরোদ আছে ওদের নামে রিপুট ল্যাখার? আইসছে শালারা রিপুট মারাইত্যে।’ 

ছেলেটির কঠিন মুখাবয়ব, জোড়া ভ্রুর নিচে রক্তাভ চোখ আর নির্ভিক তেজ দেখে আরাধ্যর বিস্ময় বাড়ে। কাজরী পাশে এসে নিচুস্বরে আরাধনাকে বলে, ও হচ্ছে পুষ্পের খালাতো ভাই সুখেন। 

আরাধ্য উদ্বিগ্ন। এতক্ষণ ভাবছিল ঘরপোড়া উদ্বাস্তু লোকেরা থাকবে কোথায়? পার্শ্ববর্তী স্কুলে যদি কোনো ব্যবস্থা হয়! দেখা যাক, চাচাজানের কথা নিশ্চয়ই বৃথা যাবে না। বৃথা যায়নি। তবে পোড়াভিটে ছেড়ে আসা উদ্বাস্তু নর-নারী শিশু-বৃদ্ধা সমত্ত মেয়ে, লায়েক ছেলে সবাই একই স্থানে থাকবে কী নিয়মে, সেসব বিধিব্যাবস্থা নিয়ে চিন্তিত গ্রামের ধর্মপ্রাণ, কিছু প্রভাবশালী। সামাজিক নিয়মে ভাটা পড়–ক -এতটা উদাসিন কোনকালে থেকেছে কে!

স্কুল-বারান্দায় জড় হওয়া প্রত্যেকের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসা-কমিটির পক্ষ থেকে দুজন এসে কিছু কানুন জানিয়ে গেছে- মেয়্যেলোকেরা যেন মাদ্রাসার সামনের দিকে না যায়। 

 

অগ্নিকান্ডে বিমর্ষ আবেদ আলী। সেই একাত্তরে রাজাকারের কুচক্রে গ্রামকে গ্রাম পুড়েছে। আবেদ আলী বিকেলে বের হওয়ার কথা ভাবতে না ভাবতে কালো গোমড়ামুখি আকাশ নেমে আসছে নিচে। সন্ধ্যা ঘনাবার আগেই আরো বেশি অন্ধকার দলা পাকিয়েছে। 

একবার স্কুলে যেতেই হবে, ওরা কী অবস্থায় আছে। বারান্দার দেয়ালে মোটা হুকে ঝুলে থাকা ছাতাটা নেয়। 

আবেদ আলীর মেজাজ-মর্জি ভালো নেই বোঝে আরাধনা, জানে চাচাজান এখন কোথায় যেতে পারে, তবু বলে- চাচাজান মেঘ মাথায় নিয়ে বেরোচ্ছেন! কেন যেন বসে পড়েন আবেদ আলী। বলেন, আরাধ্য কফি দে তো মা।

আবেদ আলী হাতাওয়ালা চেয়ারে হেলান দিয়ে কফির অপেক্ষায়, কী যেন ভাবছেন। দরজার আওয়াজ শুনে মুখ তুলে চাইলেন। এ সময় অয়ন বাইরে যায়। পাশকাটিয়ে যেতে যেতে বলে- আব্বা, আপনাকে বলা হয়নি, আমাদের সামনে নদীর বাঁধসহ রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পটা পাচ্ছি আমি।

আবেদ আলী আকাশ থেকে পড়েন, তুই পাচ্ছিস মানে? কীভাবে? কই কখনো তো এ ব্যাপারে বলিসনি কিছু। তাছাড়া তোর এসব কাজ করার যোগ্যতা হলো কবে থেকে?

-হটলাইন থাকলে পাওয়া যায়।

-হটলাইন! পার্টিতে ভিড়েছিস? নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে পারলে করে দেখা।ওসব লাইন ধরা ছেড়ে দে।

-কী বলছেন? কেউ পায় না আর আমি ছেড়ে দেবো?

-এভাবে পাওয়াটা আমার কাছে খুব অসম্মানের।

-ওসব ব্যাকডেটেড মরালিটি নিয়ে কি বাঁচা যাবে?

-তোর কাছে কি সেটা শিখতে হবে?

-ওসব বাজে ইগো ছেড়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেন আব্বা।

-বুঝেই বলছি, ইমিডিয়েট ছেড়ে দিবি ওসব কাজ। 

 

চাচাজানের জোর গলা শুনে আরাধনা আর কাজরী ঘরে আসে হন্তদন্ত।অয়ন উগ্র মেজাজে বলে গেল-

-আব্বা উপরে ওঠার চেষ্টায় আমার কোনো কাজকে আপনি কোনোদিন সমর্থন করেননি।

-তুই যেসব সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাস তা ভঙুর। যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যাবি খাদে।

 

কথাগুলো চেঁচিয়ে বলেন আবেদ আলী। ততক্ষণে অয়ন চলে গেছে উঠোন পেরিয়ে। মেঘ ডাকে সজোরে। আরাধনা বাকরুদ্ধ। 

আবেদ আলী চেয়ারে হেলান দিয়ে একহাতে চশমা খুলে অন্য হাতের তালু দিয়ে কপালের মাঝখান থেকে দুপাশটা দুবারে মুছে নেন। মেঘের গর্জন বাড়ছে। ভেতর বাহির সবখানে। 

আবেদ আলী মাথায় ছাতা ধরে স্কুল বারান্দায় উঠে এসে গায়ের চাদরে ছিটেলাগা পানি ঝেড়ে নিয়ে খেয়াল করেন- মুড় মুড় করে মুড়ি চিবিয়ে চলেছে ছেলে বুড়ো শিশুরা। কারা যেন দুই টিন মুড়ি দিয়ে গেছে।

স্কুলের আয়া সুমিতা রাণী আশপাশের গেরস্থদের থেকে চাল ডাল উঠিয়ে খিচুড়ির ব্যবস্থা করেছিল দুপূরে। রাতের খাবার ব্যবস্থাস্বরূপ আবেদ আলী তার বাড়িতে পাঠালেন একজনকে, চাল ডাল তেল পেঁয়াজ নিয়ে আসতে বলে নেমে পড়লেন। সরকারি কোনো ব্যবস্থা না আসা অব্দি স্কুল-কমিটির লোকজন আর স্থানীয় সমর্থবান গেরস্থদের সাথে আলোচনা করে এই ঘরপোড়া মানুষগুলোর থাকা-খাবার ব্যবস্থা করতে হবে, এমন ভাবনা নিয়ে আবেদ আলী হেঁটে চলেছেন।

জনশুন্য পথ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মিনিট দশেক হাঁটতে হবে। তেরছা বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসের বেগও বেড়ে যায়।ততক্ষণে উঁচুু ঘন গম-ক্ষেতের পাশে এসে পৌঁছান, আশপাশে এমন কোনো ঘরবাড়ি বা দোকানপাট নেই যে আবেদ আলী কোথাও ঠাঁই নিতে পারেন।আরেকটু এগোলে পোড়োমন্দির।দেয়ালের ভেতরে দাঁড়ালে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেতো, কিন্তু পরিত্যক্ত ঐ ভঙুর স্যাঁতসেতে চার দেয়ালের ভেতর এক চিলতে জায়গা সাপ-পোকার আস্তানা। 

ঘন গমক্ষেত পেরিয়ে কালভার্টের পাশে দোচালা টংঘর, ভেতরে বাঁশের মাচা। ওটার ভেতরে কুশার-ক্ষেতের পাহারাদার থাকে রাতে। আবেদ আলী ওদিকে এগোয়, একটা গোঙানির অস্পষ্ট শব্দ আসছে মনে হচ্ছে ওদিক থেকেই। পায়ের জোর বাড়িয়ে যতো এগোচ্ছেন তত স্পষ্ট- মেঘের গর্জনের সাথে চিৎকারধ্বনি মিলেমিশে ছড়িয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত-ভয়ার্ত শব্দ। দূর থেকে সনাক্ত করা অসহজ। আরেকটু এগিয়ে নিশ্চিত হন- মেয়েলি কন্ঠ!এভাবে যন্ত্রণা উগরে গোঙাচ্ছে কেন! 

মনে আশংকা নিয়ে আবেদ আলী আরো দ্রুতপায়ে টং-ঘরটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হুড়মুড়িয়ে তিন চারটে ছেলে ঝড়ের বেগে দৌড়ে পালায় দিকে দিকে। আবেদ আলি বিদ্যুতের বেগে টং ঘরের বেড়া ঠেলে যা দেখেন তাতে মানসিক ধাক্কা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ছেঁড়াছুটো পোশাকে পড়ে থাকা বিধ্বস্ত মেয়েটিকে দেখে ভয়ানক আঁৎকে ওঠারই কথা। আবেদ আলীর বুকের ভেতরে কে যেন ভীষণ বিভৎস খামচি দিয়ে ধরেছে। পালিয়ে যাওয়া পশুগুলো কারা- তা নিয়ে ভাবার আগে মেয়েটিকে হাসপাতালে নেবার কথা ভাবেন আবেদ আলী! নিজের গা থেকে চাদর খুলে মেয়েটির গায়ে দিতেই মেয়েটি ডুকরে কেঁদে ওঠে- কাকা!

আবেদ আলী চিনতে পারে না- কী নাম তোর মা! বাড়ি কোথায়? উঠে আসতে পারবি? 

মেয়েটি নাম বলে, পুষ্প।কেঁদে কেঁদে বলে- বাড়ি যাবো না… গলায় ফাঁস দেবো আমি।

আবেদ আলী ওকে পাঁজরে জড়িয়ে ঝোপঝাড়ের সরু গলিটুকু হাঁটিয়ে নিয়ে আসেন সামনের পিচ সড়কে। ভ্যান থামিয়ে মেয়েটিকে তুলে নেবার কথা বললে ভ্যানওয়ালা মালামাল পেছনে সরিয়ে সামনে  জায়গা করে দেয়। একপাশে পুষ্পকে উঠতে বলে আবেদ আলী অন্যপাশে উঠতে গিয়ে বুকে ব্যথা অনুভব করেন। 

থানায় মামালা করা, হাসপাতাল অব্দি পৌঁছানো, মেয়েটির চিকিৎসার ব্যবস্থা, তারপর খবরটা চাউর হতে না হতেই জড় হওয়া দু’চারজন গ্রামবাসির সাথে ঘটনাটি নিয়ে কথাবার্তা।আবেদ আলীর বাড়ি ফিরতে অনেক রাত।   

 

পথিমধ্যে বুকে ব্যথা বাড়ে, আবেদ আলীর তোয়াক্কা নেই তাতে, স্নায়ু দখল করেছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সদ্য কয়েকটি বিভৎস ঘটনা।এতগুলো ঘরপোড়া লোকের থাকা খাওয়ার অনিশ্চয়তা, পাশবিকতার শিকার মেয়েটি হাসপাতালে বাঁচা-মরার মাঝখানে। যদিও পুলিশ ২৪ ঘন্টার মধ্যে পশুগুলোকে সনাক্ত করে আটক করবে আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু তাতে মেয়েটির কষ্ট কতটুকু লাঘব হবে? প্রাণে বেঁচে উঠলেও সামাজিক লাঞ্ছনায় পুনঃপুনঃ তার মৃত্যু ঘটবে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। উহ..!

আবেদ আলীর গলার আওয়াজ পেয়ে দীর্ঘ-দুঃশ্চিন্তার ভেতর থেকে আরাধ্য আর কাজরী বেরিয়ে আসে উঠোনে।গম্ভীর হয়েই সোজা ভেতরে যান তিনি। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় চাচাজানকে বিধ্বস্ত দেখে আরাধ্য কোনোরকম প্রশ্ন করা থেকে আপাতত বিরত থাকে।একগ্লাস ঠান্ডা পানি এক নিঃশ্বাসে গলাধঃকরণ করে চোখ বোঁজেন আবেদ আলী। ‘উহ্’ যন্ত্রণাময় উচ্চারণ শুনে কাজরী বলে- কী হলো আব্বা! আরাধ্য উদ্বিগ্ন।নিচু স্বরে বলে- রাত শেষ হতে দেরি নেই, চাচাজানের বিশ্রাম দরকার।  

হাসপাতালে শায়িত ক্ষত-বিক্ষত মেয়েটির কথা বিস্তারিত বলে আবেদ আলী। বৃষ্টিমুখর অবশিষ্ট রাত নির্ঘুম কাটায় ওরা দু’বোন।

 

মেঘাচ্ছন্ন চারপাশ। উড়ন্ত ধুলোরা দমে গেছে, ভেজা উঠোন থমকে তাকিয়ে আকাশে, পুনরায় মেঘভাঙা জল নামার সম্ভাবনা।আরাধনা তন্দ্রাচ্ছন্ন থেকেও অনুভব করে- মেঘের গর্জন আর এক অনাকাক্সিক্ষত শব্দের মাঝে তফাৎ। শা করে গাড়ি থামার শব্দ।এত ভোরে কে! ঘুমভাঙা আলস্যকে ঘষে মেজে তুলে দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়তেই সম্বিত পায় মেঘে মেঘে বেলা হয়েছে। 

দু’বোন সিঁড়ি ভেঙে নিচে আসে, ততক্ষণে আবেদ আলী ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসতে দিয়েছেন তরুণ ইনসপেক্টরকে।আবেদ আলীর এক সময়ের ছাত্র এই নবাগত অফিসার। পা ছুঁয়ে চাচাজানকে সালাম করে বলে-

স্যার, ঝোপের ওপাশে টংঘরে এই ওয়ালেটটা পাওয়া গেছে।এতে সাঁটানো পাসপোর্ট সাইজের এই ছবিটা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!

আবেদ আলীর অভিব্যক্তি এমন ভয়ানক আকার ধারণ করে যে- আসন্ন ঝড় প্রচন্ড বেগে আসতে বিলম্ব করার সাহস হারিয়েছে। আবেদ আলী নিঃশব্দে আঙুল তুলে অয়নের ঘর দেখিয়ে দেন। ইন্সপেক্টর বিলম্ব না করে কনস্টেবল দুজনকে নির্দেশ দেয়। আরাধনা ও কাজরী ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব,ওদের স্থিরদৃষ্টি অয়নের ঘরের দিকে।বাড়ির উঠোনে, কলপাড়ে কর্মরত পরিচারিকাসহ অনেকে জড় হয়েছে ততক্ষণে।সম্ভ্রান্ত বাড়ির এইসব কেচ্ছা প্রতিবেশিরাও না দেখে থাকবে কেন! 

ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়িটা চলে গেলো জড়ো হওয়া মানুষের দৃষ্টির বাইরে।অসংখ্য মুখ-নিঃসৃত প্রশ্নের বুদবুদের মধ্যে থেকে কাজরীর হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যায় আরাধনা। 

চাচাজানের থমথমে মুর্তি চিন্তিত করে আরাধনাকে।আবেদ আলীর ঘরের দিকে যায় আরাধনা, দরজায় দাঁড়িয়ে দ্যাখে নিস্পৃহ তাচ্ছিল্যে ঘাড় হেলিয়ে আছেন চেয়ারে।আরাধনা ডাকে- চাচাজান! আবেদ আলীর পলকহীন অনড় মুখাবয়ব, শরীরের অতি স্থিরতায় নি:সন্দেহে কালক্ষেপণ করতে ভরসা পায় না আরাধনা।চেয়ারের হাতল ছেড়ে ঝুলে থাকা হাত স্পর্শে হিম অনুভব! আরাধনা হাতের নাড়ি পরখ করে টের পায় পৃথিবীর বাতাস থেকে চাচাজান চূড়ান্তভাবে গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস।আরাধনা চিৎকার করে ডাকে কাজরীকে।  

                   

শোকাচ্ছন্ন বাড়ির মানুষগুলোর সাথে ঘাস-পাতা, বাতাসের কণা, পাখি, গাছগাছালি কয়েকদিন যেন স্থবিরতায় নিমজ্জিত! সারাদিন বৃষ্টি। সূর্য ডুবে যাবার আগে প্রকৃতিকে উদ্ভাসিত করে ভেসে চলা মেঘের ছেঁড়া ছেঁড়া আস্তরণ রঞ্জিত গাঢ় সিঁদুরে রঙে।  

আরাধনা অনুভব করে আবেদ আলীর মৃত্যুতে এই জগৎ সংসারে আরাধনার মাথার উপরের ছায়া সরে গেছে।অথচ এখন কাজরীর অভিভাবক বলতে আরাধ্য। 

কাজরীকে সাথে নিয়ে গাঁয়ে বের হয়। কাজরী ধীরে ধীরে এগোয় বোনের পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে উঁচু রাস্তা থেকে দুপাশে যতদূর চোখ যায়- ফসলের মাঠ, বাগান দেখতে দেখতে চাচাজানের কথাগুলো খুব বেশি মনে পড়ে- চাচাজান মাঠের ধানের জমি দেখাতে নিয়ে যাবেন বলছিলেন একদিন। 

আরাধনা সেদিন রাতে আবেদ আলীর কাছ থেকে জায়গা জমি বুঝে নিতে অসম্মতি জানালে, আবেদ আলী বার বার আরাধনাকে বুঝিয়েছিলেন- আমি বেঁচে থাকতে থাকতে একটা ফয়সালা করতে চাই।

না, চাচাজান। এতদিন বাবা বিদেশে পড়ে আছে, আমি বঞ্চিত হয়েছি বাবার স্নেহ-সান্নিধ্য থেকে। তার জমি-জায়গা দিয়ে কী হবে! আরাধনার এমন কথার পর কিছুক্ষণ থেমে ছিলেন আবেদ আলী।তারপর আবার বুঝিয়েছিলেন- দেখ আরু, জমি যে তোর বাবার সেটাই বা বড় করে ধরছিস কেন? তোর বাবা পেলে বাবার হতো, তুই বুঝে নিলে তোর হবে। 

কিন্তু এ মাটি আমার পরিশ্রমের ফসল তো নয় চাচাজান! এমন উত্তরে আবেদ আলী আরাধ্যর হাত ধরে উঠোনের মাঝখানে টেনে নিয়ে নত হয়ে উঠোনের মাটি ছুঁয়ে দরাজ গলায় অদ্ভুত মেজাজে বলতে থাকেন-  

কোন্ মাটিতে কোথায় কার নাম লেখা আছে বলতো আমাকে! এই দ্যাখ, যে-ভালোবাসার জন্য তোর হাহাকার, মাটির বুক চিরে দ্যাখ, খুঁজে পাবি। কান পেতে শোন- ফাঁসির দড়িতে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরামের ডাক, সূর্যসেনের আহ্বান, রক্তের নদী সাঁতরে চিৎকার করে তীতুমীর। এ মাটিতে লেগে আছে সুভাষ, নজরুলের শ্বাস। সফেদ শুভ্র শ্মাশ্রুমুখে ডাকে মাওলানা ভাসানী। ডাকে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার, মতিউর, আসাদ, নূর হোসেন। বুকের রক্ত ঢেলে এ মাটির সোনার ছেলে লালন করতে নিজেকে নিঃশেষ করেছে কত নারী।এ মাটি কেবল একখন্ড ভূমি নয় রে…, এ মাটি চেতনার, বিশ্বাসের।এ মাটিকে হাতছাড়া করা মানে বিশ্বাসকে মেরে ফেলা…

চাচাজানের কথা-আবেগের ঘনঘটায় আরাধ্যর চোখ দুটো ভরা নদী হয়েছিল।ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ ক্ষত-বিক্ষত অনুভূতির গলিপথ ধরে উথলে আসছিল চোখের দুকুল ছাপিয়ে, আরাধ্য ধরা গলায় বলেছিলো-

কিন্তু চাচাজান, ইতিহাসের কালো গহ্বরে লুকিয়ে থাকা ভিনদেশী দালালের বংশধরেরা এই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে নানা ছল ধরে, আরাকান, মগ, পর্তুগীজ, পাঠান, মারাঠি, মোঘল, ইংরেজের দোস্ত-বেনিয়ার সন্তানেরা বাতাসে ছড়ায় বিষ। ধর্মাধর্মের ধুয়া তুলে সুবিধাবাদীরা।আর বিশ্বাসের কথা বলছো! বিশ্বাসের কথা বলেছিল মীরজাফর। বিশ্বাস রাখতে বলে প্রকৌশলীরা, ব্যবসায়ীরা, আইন প্রয়োগকারীরা।এ মাটি থেকে বিশ্বাস হারিয়ে গেছে চাচাজান।এ মাটিতে এখন ভেজাল। এ মাটিতে এখন এনজিওর গুপ্তচর ঘোরাফেরা করে।

কথাগুলো একটানে বলে আরাধ্য ডুকরে কেঁদেছিলো। চাচার বুকে মাথা রাখতেই আবেদ আলী স্বস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।আরাধ্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো।আবেদ আলী ঠিক বুঝেছিলেন, আরাধ্য এসব কষ্টের কথা প্রকাশ করছে ওর বাবার প্রতি রাগে-অভিমানে। বহুদিনের সঞ্চিত ব্যথা-বঞ্চনা এসব। আজ যতটা পারছে নিংড়ে দিক। বৃষ্টি-ঝরা ঝকঝকে আকাশ হয়ে উঠুক আরাধ্যর হৃদয়।তারপর যে বোধ অবশিষ্ঠ রয়ে যাবে তারই স্তর পড়–ক পলির মতো।আবেদ আলী শান্তস্বরে ধীরে বলেছিলেন-

এই ভূমিতেই আছে পথের দিশা। এই নদনদী, অববাহিকায় হাজারো জনপদ, ঘাট-মাঠ, বনানী, পাখপাখালীর সাথে মিশে আছে জীবনের সমাধান।উজানে-ভাটিতে, দুঃখে-সুখে লাখো কোটি মানুষের বুকে তবু উথাল পাথাল আশা।সে আশা এ মাটির সাথে জড়িয়ে। 

চাচাজানের এ সকল কথায় আরাধ্যর স্নায়ুর ভেতর নড়েচড়ে উঠছে মাটি, এক অদৃশ্য শক্তি! 

আরাধনা আর কাজরী বাগানের ভেতর মেঠোপথ ধরে হাঁটে। সামনে সুখেনকে দেখে কাজরী বলে- সুখেন! 

আরাধ্য বলে- ভালো হলো তোমার দেখা পেয়ে। কর্মঠ পুরুষলোকগুলো বাইরে মজুর খেটে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে।ওদের এখন পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। 

-জ্বী দিদি। 

মিনিট পাঁচ এর মধ্যে ওরা স্কুল-মাঠে পৌঁছায়।

আরাধনাকে দেখে স্কুলবারান্দা থেকে মাঠে নেমে আসে সুরেশ পাল, যতীন মুন্ডা, খগেন দাস, পরিমল গাইন সেই সাথে পুষ্পের মা।আবেদ আলীর মৃত্যুর পর এই প্রথম ওদের সাথে দেখা করতে আসে আরাধনা। পূর্বে কখনো কোনো বিষয় নিয়ে সরাসরি আলাপ না হলেও ইতোমধ্যে এরা সবাই খানিকটা বুঝেছে ওদের জন্য আরাধনা কিছু ভাবছে। 

ওদের অপ্রস্তুত ভাব লক্ষ্য করে আরাধ্য বলে, কাকা গরম পড়েছে, মাঠেই বসি। ঘাসের উপরে হাঁটু ভাঁজ দিয়ে আরাধ্যকে বসতে দেখে নিতাই মন্ডল, শিবরতন দাস, আনন্দ পাল, যতীন মুন্ডা, খগেন সরকার, পরিমল দাস ওরা বসে একে একে। অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করে আরাধ্য। ওরা বলে- অনেকে কাঁটাতারের ওপার চলে গেছে, সেয়ানা মেয়ে নিয়ে থাকবে কোন্ ভরসায়! সুখেন আর পুষ্পর মা দূরে দাঁড়িয়ে। আরাধ্য সেদিকে লক্ষ্য করে, ভূমিকা ছাড়াই বলে- 

আপনার ঘরের জন্য বাঁশ-খুটি, ইট-বালি যা লাগে দেবো। পুষ্পর কেস নিয়ে আপোষ করবেন না। অপরাধী হোক সে আমার চাচাতো ভাই, বিচার হতে হবে। শুধু মাসি কেন, অন্যরাও আমাদের বাঁশঝাড় থেকে কিছু বাঁশ কেটে আপাতত আপনাদের পোড়াভিটেতে দোচালা করে উঠে যেতে পারেন। 

আর নদী পাড়ে আমাদের আট বিঘার জমিটায় একসাথে চাষ করবেন। না, দিন মজুর হিসেবে না! ফসলের ভাগ থাকবে। 

চাপা স্বরে কথাবার্তা শুরু হয় সবার মধ্যে। স্কুল বিল্ডিংয়ের অন্যপাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে বিমল মুন্ডা, সুরঞ্জন পাল, নরেশ পাল। নরেশ পাল বয়সে প্রবীণ। নরেশ পাল বলে- পুষ্পর কেস চলবে। কিন্তু মাগো তোমাদের নদীপাড়ের জমি চাষের ব্যাপারে যা বলছো-  ভেবেচিন্তে বলছো? 

ভেবে বলেছি কাকা। আরো পরিস্কার করি- আমার জমি, আপনাদের শ্রম। উৎপাদিত ফসলের সমান সমান অংশ। কাল ভোরে আপনাদের অপেক্ষায় থাকবো। আরাধ্য আর কাজরীর চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে থাকে ওরা।আরাধনার কথাগুলো ওদের চোখেমুখে জ্বলতে থাকে সকালের ঝকঝকে রোদের মতো। 

হাঁটতে হাঁটতে কাজরী ডাকে- আরুদিদি! সাজিদকে আসতে বলি? আমাদের সাথে কাজ করতে বলি? আরাধনা স্নেহমিশ্রিত স্বরে সম্মতি দেয়- বলিস।

পথের বাঁক ঘুরতে গিয়ে স্থবিরতা নেমে আসে আরাধ্যর পায়ে। থমকে দাঁড়ানো দেখে কাজরী বলে- কী হলো দিদি, দাঁড়ালে যে! স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে আরাধনার অবলোকন- 

কাজরী, দেখেছিস যুথবদ্ধতার ঐশ্বর্য ! অক্ষর-জ্ঞানহীন হতদরিদ্র মুন্ডাগোষ্টি, অথচ ঐ দ্যাখ- জীবনে টিকে থাকার যুদ্ধযাত্রায় কেমন একতাবদ্ধ!

এক অদ্ভুত মুহূর্ত ছবির মতো আটকে যায় আরাধনার দৃষ্টিতে। চারপাশ থেকে ঘিরে আসা অন্ধকারের মাঝে যেন কতগুলো তারা জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠেছে খোলা মাঠ জুড়ে। হারিকেন-কুপির আলো জ্বেলে বসেছে কয়েকজন। প্রত্যেকের স্ত্রী কন্যা বোনেরা একযোগে হারিকেন নিয়ে সন্ধ্যার আলো জ্বালাতে বসেছে, মাঠজুড়ে এমন গুচ্ছ গুচ্ছ আলো জ্বলে ওঠা দৃশ্য কী অভাবনীয়, জীবন-জানালার কপাট খোলার দীর্ঘ বাসনায় যে মন্ত্র পুষে রেখেছে, এই আলোক ছড়ানো মাঠ যেন তারই চিহ্ন-চিত্র! এখনও হয়ত নগরের কোনো ডেভেলপারের চোখ পড়েনি এ গ্রামে।

 

রাত্রি গাঢ় হবার প্রাক্কালে জলাডোবায়, কাদামাটির রাস্তার খাঁজে জমে থাকা বৃষ্টির পানি রূপালী বর্ণ ধারণ করেছে। রংচটা ফিকে পুরোনো টিনের থালার মতো আকাশে লেপ্টে আছে একাদশীর ভাঙা চাঁদ। মাঝে মাঝে আলতা-ভেজা তুলোর মতো কয়েক খন্ড মেঘ ভেসে চলছে চাঁদ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। বাঁশের কঞ্চি, পাতার নড়াচড়ায় ভিজে গ্রামটা বাজছে সর সর শব্দে। বাঁশবাগানের শব্দের ঐকতানের মতো যদি গ্রামের মানুষগুলোর দিনযাপন হতো! অথবা একযোগে ব্যাঙগুলো যেমন ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ করছে! ঝিঁঝিঁরাও একে একে তুলছে কেমন সংহারি ডাক! তুমুল বর্ষার বিধ্বস্ত কলাগাছের ছিন্ন পাতায় বাতাসের ঝাপটে মনে হচ্ছে অশ্বারোহীর হাতে উড়ন্ত পতাকার পত পত শব্দ। বৃক্ষরাজির হালকা মাতামাতির অভ্যন্তরে একটা গ্রাম এখন নিস্তব্ধ। সৌম্য পদক্ষেপে আরাধনা এগোচ্ছে আশপাশের ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের উদগীরণ মেখে মেখে।

এলিজা খাতুন, ১৯৮১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অরুণবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মহানন্দা নদীতীরে বেহুলা গ্রামে পৈত্রিক বাড়ি, বাবামো: মাসদুল হক, মামোসা: মাসকুরা বেগম। খুলনা ভিক্টোরিয়া স্কুলে প্রথম লেখাপড়া শুরু। সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এসসি গণিত বিষয়ে পড়াশোনা। সাতক্ষীরা জেলা সদর মেহেদীবাগে বসবাস। একটি মানবসেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান Ôঋশিল্পী হস্তশিল্প বিভাগে এক্সিকিউটিভএইচ.আর পদে কর্মরত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থনৈঃশব্দ্য ছোঁয়া জল (২০১৭), মধ্যরাতের খামে (২০১৮), ভাঙনকাল (২০২০), শ্রাবণ জানালা (২০২০), আরাধ্য পথের দিকে (২০২০) এবং গল্পগ্রন্থবর্গামাটি (২০১৮), ভাটির টানে (২০১৯), আগুন গোঁজা মাটি (২০২০) সম্মাননা : উতল হাওয়া সাহিত্য সম্মাননা(পশ্চিমবঙ্গ)

 

ইমেইল : alizasat335@gmail.com

এলিজা খাতুন
কবি ও গল্পকার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top