শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
মোহাম্মদ হোসাইন এর একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬
মোহাম্মদ হোসাইন এর একগুচ্ছ কবিতা
মেঘের বাছুর
কবিতাই কেন লিখতে হবে আমাকে
জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছিল
একটা বাবুই তখন ওষ্ঠে খড় নিয়ে প্রথাগত সুঁই সুতোর বাইরে সেলাই শিল্পে নিবিষ্ট প্রযোজনায় মগ্ন ছিল। হাওয়া এসে রোদের ঝালর এসে বুনন শিল্পে
মায়াবন বিহারিণী হরিণী গানের দোঁহায় মাথা ঝাঁকাচ্ছিল…
আমি তখন কৈলাস থেকে ফিরছি
মাথায় হাজারো ভোল্টের চাঁদ নরম জোছনা ছড়াচ্ছে
কোথাও এক ফোঁটা ঝিঁঝিঁ পোকা নেই
অথচ, স্বপ্ন রাঙা ভোর চলে এলো আচমকা
চেয়ে দেখি মেঘের বাছুর ঘাস খেয়ে খেয়ে দুধ-বৃষ্টি দিচ্ছে… আমার সে কী আনন্দ…!
এখনো আমি সেই দৃশ্য চোখ বুজে পান করতে থাকি
২৪/০২/২০২৬.
বেয়নেট খোঁচানো
একেবারে এফোঁড়ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়
অভেদ্য নিশানা তার
কিছুই লাগে না… না কার্তুজ না গুলি…
হাতাহাতি গলাগলি গালাগালি সব সব
বৃষ্টি এলে ছাতা হয় রোদ ওঠলে ছায়া
বুকের ভিতরে টুনটুনির বাসা, অজন্তা ইলোরা
তখন পৃথিবীর সব মাস ফাল্গুন ফাল্গুন
তখন পৃথিবীর সব পাখি কোকিল কোকিল…
সাপের গলা ধরে ঘুমিয়ে থাকে সেই সে ক্ষণ
ঝড়ের বুক ছিঁড়ে নিয়ে আসে কস্তুরির ঘ্রাণ
হালটের পর হালট একাই দৌড়ে আসে
তিন চক্কর শেষে বলে ওঠে শুধু তোমার জন্য
এই বেয়নেট খোঁচানো আমার প্রাণ…
২৪/০২/২০২৬.
জুডাসেরা
বাইরে যাবার ছলে ঘরেই ঘুরঘুর করি
মাঠের গাড়িয়াল তবু গামছা বাঁধা দই – ভাওয়াইয়া গানের কলি, অরূপ জলের গান…বাতাসে ভিজিয়ে দিয়ে যায়…
উঁচু উঁচু টিলা, নীরব নীরব নদীর বুক
খোলা বারান্দা কিংবা জমে থাকা ধুলো
দাঁড়িয়ে থেকে থেকে দেখে নিই আর
প্রাণ ভরে পান করে নিই গরিমা সুধার
মাঝে মাঝে ভাবি–
কার কাছে রেখে যাব আমার এই প্রহেলিকা সময়
কাকে আমি করে নেব নিজের পাঁজরের পাঁজর খোঁচানো ললিত তস্কর
সবকিছু অধরাই থেকে যাবে?
সবকিছুই কি থেকে যাবে অলীক অলীক
যেমন থেকে যায় নক্ষত্রের ছাই, লীলাময় রাত
বারে বারেই ফিরে আসে নিখিল রণের ছেঁড়াখোড়া অধিবাস
জেগে ওঠে সুচতুর নাগ জিঘাংসা মত্ত অভুক্ত কুকুর
দিক নেই দিগন্তের আয়ু ক্রমাগত নিভে আসে মানুষের বেশে আসে অজস্র কফিন জুডাসের
যুগ যুগ কি তবে জুডাসেরাই মৃত্যুহীন
২মার্চ,২০২৬।
সমন
আমি এখন
আমি এখন সত্য ধরনের কথা বলব
আমি দ্রুত চেঞ্জ করে নেব আমাকে
আমার তো সবই গেছে
বাকি আছে অর্ধসত্য মা আর ছেঁড়া শাড়ি
আমি তা নিয়েই সুখে থাকব দুঃখে থাকব
ঐশি কুসুমের ভিতর দিয়ে ভোর আসছে
এই ভোরটুকু আমার এই আলোটুকু আমার রক্তের নিঃশ্বাসের…অব্যক্ত উচ্ছ্বাসের
একে আর হেলাফেলায় নষ্ট হতে দেব না… দেব না…
পিতলের ঘোড়া তুমি আর এদিকে এসো নাকো
আমি ক্ষ্যাপা হয়ে আছি
আমি খুব খুব অস্থির হয়ে আছি
কখন কী করে বসি নিজেও তা অবিশ্বাস্য মানি
ও বরাহ শাবক তৈরি হও
মৃত্যু ও মৃত্তিকা সমন পাঠাচ্ছে…
১৫/০২/২০২৬.
করিমের গান
করিমের গান গেয়ে কেউ একজন যাচ্ছে
গানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সুর মিলাচ্ছে
অন্য আরেকজন: ধীর লয়ে জেগে ওঠছে পাখি প্রকৃতি, সংসার…
আমি চিরদিন মৌনতা কুড়াই
শিশির মাখানো ঘাস, রশ্মিময় চোখ
যেন অনন্তের মেটাফর…
করিমের গান থামে না
যেমন থামে না বসন্তের হাওয়া
সুচরিতমেষু বিশ্বাস…!
১৫/০২/২০২৬।
কবি পরিচিতি
কবি মোহাম্মদ হোসাইন–এর জন্ম ১৯৬৫ সালের ১ অক্টোবর, সুনামগঞ্জে। লেখালেখি শুরু ছোটবেলাতেই। নানা পত্রিকায়, নানা মাধ্যমে চল্লিশ বছর ধরে নিরন্তর যাত্রা। কবিতাই তাঁর ধ্যান, নিমগ্ন আরাধনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে পেশা হিসেবে নিয়েছেন শিক্ষকতাকে।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
ভালোবাসা নির্বাসনে গেছে (১৯৯৫)
মেঘগুলো পাখিগুলো (২০০১)
অরণ্যে যাবো অস্তিত্বে পাপ (২০০৩)
পালকে প্রসন্ন প্রগতির চাকা (২০০৪)
ভেতরে উদগম ভেতরে বৃষ্টিপাত (২০০৬)
মেঘের মগ্নতায় রেশমি অন্ধকার (২০০৯)
বৃষ্টির গান মায়াবাস্তবতা (২০১২)
রূপপ্রকৃতির বিনম্র চিঠি (২০১৩)
নৈঃশব্দ্যের এস্রাজ (২০১৪)
অন্তিম জাদুর ঘূর্ণন (২০১৫)
বিভাজিত মানুষের মুখ (২০১৫)
অনূদিত রোদের রেহেল (২০১৫)
ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে (২০১৭)
তুমুল বেজে ওঠে অন্ধকার (২০১৯)
হায়ারোগ্লিফিক্স (২০২০)
চেনা গন্ধের মেটাফোর (২০২১)
ঈশ্বরের ছায়াচিত্র (২০২২)
ফেসবুক
Mohammed Hossain