শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬। মহিবুল আলম এর একগুচ্ছ কবিতা

Spread the love

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

মহিবুল আলম এর একগুচ্ছ কবিতা

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

 

মহিবুল আলম এর একগুচ্ছ কবিতা

বিফলা উপাখ্যান

।। এক ।।

বিফলা যে পঞ্চাশ বছর বা আরও বেশি সময় বেঁচে আছে সেটাই বড় কথা- 

সে এখন সত্তর বছরের বুড়ি। যদিও বিফলার সত্তর একটা বয়স মাত্র।

সে দিঘল রাত পেরিয়ে এখনও ভোর অবধি দীর্ঘপথ হাঁটে। অবিরাম সময়।

কখনও সারাদিন, বিকেলের গোধূলি বেলায়, সন্ধ্যার জামরং কালো অন্ধকার অবধি।

অষ্টপ্রহর। ঘুমের মধ্যেও সে গোপালপুরের হাবিল চকের বটগাছের তলায়

ভূত দেখে হাঁটে। হাঁটার ভেতর ভূতের সঙ্গে বাতচিত করে হাসির খোরাক পায়।

ভূতের খাবলে ধরা মানুষের মাংস, আঙুল থেকে খসে পড়া অসংখ্য ফোঁটা ফোঁটা রক্ত

তার অদ্ভুততর হাসি পায়।

তার হাসি কেমন ভয় ধরিয়ে দেয়।

 

।। দুই ।।

বিফলার সেই হাসির কাহিনি পঞ্চাশ বছর বা আরও আগে শুরু হয়েছিল।

সে এক অন্য গল্প-

তার তখন যুবতীর সন্ধিক্ষণ। এক পাকিস্তানী হানাদারের কাছে ষোলতে সে

একবার পেছন থেকে আঁচড় খায়। সেটা যুদ্ধের সময়, একাত্তরে-

তার সেই বাড়ন্ত শরীর, উঁচু জমিন, টানা চোখ, থিতানো পিঠ আর

মরঝরা বিলে রোদ-বৃষ্টির খেলায় পুড়তে পুড়তে তামাটে তাতানো একখান মুখ।

কাঁদায় লেপটে থাকা বুক নিয়ে সে একদুপুরে নিজের জমিন কাঁপিয়ে পালাতে গিয়ে

গোপাটের বেতগাছে জড়িয়ে পাক হানাদারের এক জোয়ানের কাছে ধরা পড়ে।

সেদিন দুপুরে কী যে বেদম খরা ছিল!

কাদামাখা খালি গতরে নারিকেলের চিরল পাতার প্রখর আদর।

হাঁটু ভাঙে- একবার, দুইবার, তিনবার। এরপরের গল্প অন্য। বহুজনের-

হানাদার যখন সেদিন ভারি নিঃশ্বাস ফেলে বেয়নেটের খোঁচায় খোঁচায় তার মধ্যস্থলে

কাঁঠালের ভূতির মতো ফালি করে, তখন সে

ব্যথায় কুঁকড়ে না ওঠে প্রথম দিঘল হাসি দিয়েছিল। সে কী হাসি!

হানাদার তার হাসি দেখে বলে ওঠে- ‘লে হালুয়া…!’

তার হাসিটাই সেদিন তাঁকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। 

।। তিন ।।

বিফলার হাসি কোনো কালেই কাল হয় না, জীবন বাঁচায়।

এবার তার আত্মজার গল্পটা বলি। তার সেই আত্মজা সিতারা-

সিতারার জন্মটাও তার সেই হাসির কারণে। এক হানাদার থেকে অন্য হানাদার

এক ঘর থেকে অন্য ঘর, শরীরে শরীর বদলায়। দেহের পর দেহ।

মোকামও বদলায়। শরীরের এই অদলবদল খেলায় একদিন সে

নিজ শরীরে মানুষের গন্ধ পায়। বিচ্ছিরি গন্ধ, বমি বমি আসে-

পাকিস্তানি এক মেজর তার ফোলা পেট দেখে বলে ওঠে, ‘আবে হে, কীয়া হুয়া?’

বিফলা মনে মনে বলে, ‘হুক্কা হুয়া…!’ সে হাসে, খলখল, কুটি কুটি-

বিফলার সেদিনের বেদম হাসিটা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

পাকি সেই মেজর বলে ওঠে, ‘আবে যাও, তুম আজাদ হো…!’

বিফলা যদিও সেই আজাদ শব্দটার মানে কী, কোনোদিন বোঝেনি। আজও না।

এই পঞ্চাশ বছর বা আরও বেশি সময়টাতেও না।

।। চার ।।

বিফলা আবারও হেসেছিল যুদ্ধের পর, সেটাও পঞ্চাশ বছর আগে।

পটকা মাছের মতন পেট নিয়ে সে মরঝরার ঘাটে আসে।

বুড়িগাঙের ঘাট, ছাপরার ঘর। সুবোধ মাঝির খেয়া নৌকা। একটাই সম্বল-

তার ঘর-গেরস্থালি ও ভিটে, সবই পাক হানাদারের পেটে গেছে। বউটাও।

খেয়া নৌকাটা শুধু জলের নিচে ডুবে ছিল বলে এক সকালে উঁকি মারে।

সুবোধ মাঝি খতনা করে বেঁচে যায়। আসকর মৌলবিই বাঁচিয়ে দেয়।

পাক সুবেদার বলে, ‘আবে তো আব মুসলমান হো, বহুত আচ্ছা, বহুত আচ্ছা…!’

সেটাও যুদ্ধের গল্প-

আমি যুদ্ধ শেষের গল্পটাই বলি। তখন সূর্যের দুপুর। বুড়ি গাঙে জলভাঙা ঢেউ।

এ ঘাটে ঘর নেই, ওই ঘাটে ঘর। সুবোধ মাঝি হাত বাড়ায়, ‘পইসা?’

নৌকায় বিফলা একাই। পোয়াতি পেট, সেটাই সে দেখায়।

আর তার দিঘল হাসি-

সুবোধ মাঝি বলে ওঠে, ‘ ও বুজি, আর কোনো চিন্তা নাই, আমাগো দেশ স্বাধীন…!’

‘দেশ স্বাধীন!’- বিফলা এর মানে বোঝেনি। সেদিনও না।

আজও না।

।। পাঁচ ।।

বিফলা ঘাটের কাছেই ঘর বাঁধে, দালান ঘরে-

রসুলপুর আড়ঙটার উঁকিমারা একটি বটগাছ। এর শরীর ঘেঁষে একটি দালানঘর। পরিত্যাক্ত।

কপাট বিহীন দরজা-জানালা। উদোম মেঝেতে মানুষে-শেয়ালে ঢলাঢলির ছাপ।

দিবাকর ভৌমিক সেই কবে দালানটা ফেলে দেশভাগে ওপারে চলে যায়, আর ফেরেনি।

জোতদার প্রধান সুরুজ আলী মাতব্বর দালানটা একবার নিজের করে নিয়েছিল।

এক মধ্যরাতের মধ্যদুপুরে ঝাড়বাতির শিকে তার উদোম গতর ঝুলে থাকতে দেখে

সেই যে আড়ঙের মানুষের মনে ভূতের ভয় ঢোকে, তারপর দুই যুগ-

এই দালানটাকে আর কেউ নিজের করে নিতে আসেনি।

বিফলা প্রথম দেখায়ই বুঝতে পারে, এই ঘর তার।

পোয়াতি পেট নিয়েই আধেক বেলা সে সাফসুতুর করে। দেয়ালের জঞ্জাল, মাকড়শার ঝুল

মেঝের আস্তর পড়া ধুলো, চারিদিকের গজে ওঠা জঙ্গলা ও দুই যুগের অভিশাপ।

রাত হতেই সে ভূতের শরীরে গতর এলিয়ে হেসে ওঠে। আহা, ঘুম!

 

।। ছয় ।।

বিফলা আবারও মরতে মরতে বেঁচে ওঠে কোনো এক সন্ধ্যা।

আত্মজার জন্ম হয়-

আকাশে তখন আস্ত এক বিলিকাটা চাঁদ। চারিদিকে কুয়াশার চাদর।

অগুনিত জ্যোৎস্নায় বিছিয়ে দেওয়া উত্তরের টান।

ছালার চট ঠেলে হিনহিন বাতাস বয় দেহের ভেতর আত্মজার ঠেলা সামলে।

নিঃশব্দ ঘর। চারিদিকে রক্তের বান। আড়ঙে কোনো দাই নেই-

পোয়াতির বিদীর্ণ মৃত্যুতে ক্লান্তির কান্নায় কেঁদে ওঠে আত্মজা কেমন অপলক তাকায়।

বিফলার সে কী দিঘল হাসি-

আত্মজার কপালে সে মৃত্যুর তিলক এঁকে দেয় বলে, ‘মা গো, তুই স্বাধীন হ…!’

 

।। সাত ।।

দিবাকর ভূঁইয়ার দালানটাতেই বিফলার পঞ্চাশ বছর।

আসলে পঞ্চাশ নয়, আরও বেশি। সময়ের হিসেব আজকাল কে গোনে?

তারপর সে আর পোয়াতি হয়নি। আত্মজা বা আত্মজের নাড়িকাটা শাপ

মৃত সেই সিতারা আঁতুড় ঘরে ঠেলে দেয়।

একে একে মানুষ বদল হয়, দিনে-দুপুরে সেইসব শকুনের আদল-

মমিন মেম্বর, লোকমান চৌকিদার, রহমান বয়াতি, রইস মুনশি আর কতজন!

সোলাইমান দালালের সঙ্গে বউবাতি খেলতে গিয়ে একবার কেমন করে সে

জলের ভেতর মাছপাতা জালে আটকে যায়। একদিন, দুইদিন, একমাস, দুইমাস

এমনকি একটি বছর। শিবপুরে রাতভোর আনারকলির যাত্রা দেখতে গিয়ে

সেলিমের দরবারে বিফলা পুরোদস্ত আনারকলি হয়ে ওঠে। গান বাঁধে।

আড়ঙ্গে-বাজারে গুনাই বিবির পালা, কোম্পানিগঞ্জের লাকী হলে লাইলি-মজনু

মস্তানের দরগায় মানত, চাটগাঁয়ে মাইজভাণ্ডারী, আরও কত কি-

এদিকে সোলাইমান দালালের ঘরে বউ, বাইরে তার গতরের টান।

একদিন উজানের খিঁচটানে বুড়িগাঙ স্বয়ম্ভর হারিয়ে শুকিয়ে যায়।

সোলাইমান দালাল গিয়ে নিজ ঘরে ওঠে।

গাঙের চিতানো বুকে বসে বিফলা সেদিন অমোঘ দৃষ্টি দিয়ে তবুও হাসে।

বড্ড অট্টহাসি। খলবল, খলবল…! ব্লাউজবিহীন বুক ঠেলা বাতাসের মতো।

।। আট ।।

দক্ষিণের দিঘল কোণ থেকে হেঁটে এসে রাত্রি নামে। মরঝরার বুক-চেতা মধ্যদুপুর।

আড়ঙে বাজারে এতসব জঞ্জাল-

দিবাকর ভূঁইয়ার সেই পরিত্যক্ত দালানের পাটাতনে হাঁটুভাঙার কত কি মচ্ছব।

সেই কবেকার কথা! রাতভর পালা করা মানুষের চেহারা। দিনভর আলুথালু বেশ-

একদিন রহমান বয়াতি শরীরে উজানের নাও ঠেলে বলে ওঠে, ‘চল বিফলা,

অনেক হয়েছে, তোরে নিয়া নতুন গানের দল বাঁধমু নে…’।

বয়াতি কী অদ্ভুত কারণে পাঁকে পড়ে সেদিনই মারা যায়।

বিফলা হেসে ওঠে।

।। নয় ।।

তারপর কতবার বিফলার মৃত্যু হয়। চৈত্রমাসের খরা রোদে পুড়ে, আষাড়ের বৃষ্টিতে।

শ্রাবণের ঢলু জল একবার তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় হোসেনপুর পেরিয়ে গোপালপুরে।

ভাদ্রের আগুন পুড়ে শরীর জ্বলে যায়।

শীতের কষ্টে উত্তরে সে টানটান হয়। হাতপা ছেড়ে দেয়। তবু সে বেঁচে যায়।

বেঁচে গিয়ে হেসে ওঠে-

বিফলা যে পঞ্চাশ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে বেঁচে আছে সেটাই বড় কথা।

মহিবুল আলম

গোল্ড কোস্ট, কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।

ইমেইলঃ mohibulalam.K@gmail.com  

মহিবুল আলম
কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top