শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬। গল্প: তৃতীয় জন্ম- আনোয়ার রশীদ সাগর

Spread the love

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬

গল্প: তৃতীয় জন্ম
আনোয়ার রশীদ সাগর

শব্দকুঞ্জ ঈদসংখ্যা-২০২৬ 

গল্প: তৃতীয় প্রজন্ম।।

আনোয়ার রশীদ সাগর।

মাধবপুর থেকে,ভয় সংশয় ও হতাশা নিয়ে আবেদ আলির মেয়ে রোজিনা মধুখালি  গ্রামে নানীর বাড়ি   চলে আসে। এসেই আনন্দভরা একবুক আশা নিয়ে বাসা বাঁধে। বয়সে নূয়ে পড়া নানী হাজেরা যৌবনে নেচে-গেয়ে হেসে খেলে দিন কাটাতো। এখন তার একাকিত্ব জীবন। 

ভরদুপুরে ভরা গাঙে ওই ছুড়া এ-তো হাপুসহুপুস  সাঁতার কাটে ক্যান! 

কান্টায় নাঙ সাইজি -আইসি, সারারাত গাঙ করে যাইস,তাও  শখ মেটে না? 

 কতো বড়ো লুইচ্চা রে ছুড়া। রাতি কী ঘুমাইতে দেয়! যেরাম ছুঁড়া সেরাম ছুড়ি! দাঁড়া, বিয়ি দিয়ি দেবুনি।

আজই বাপমাকে ডাইকি আইনবুনি।  বুকড়া দাঁত বের করে, গাল কুচকিয়ে ঠোঁট  জড়ো করে একা একাই হাসতে থাকে।   কখন পেট বাইদি যাবিন,জাইত যাবিন আমার। 

একা একাই বলতে বলতে হাজেরা বিবি, হাতে থাকা খুঁটির উপর ভর দিয়ে,সামনে কাইত হয়ে  মাঠে তাড়া খোরগোশের মতো মাথা উঁচু  হাঁপায়। একবার মাজা খাঁড়া করে দাঁড়ায় আর একবার হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে কাইত হয়ে, সামনে পা ফেলে এবং বামের দিকে,   নদীতে সাঁতার কাটতে দেখে নাতির উদ্দেশ্যে গালিগালাজ গুলো করতে থাকে ।  হাজেরা বিবির  বড়ো মেয়ের ছেলে খালেক এবং ছোটো মেয়ের  মেয়ে রোজিনা।  খালেক আর রোজিনা খালাতো ভাইবোন।

 প্রতিরাতেই খালেক  বুড়ি নানির  ঘরের পিছনে রোজিনাকে নিয়ে কানাঘুষো করে, রাতে ঘুমাতে পারে না হাজেরা। মাঝে মাঝে গলায় খেকুড় দিয়ে উঁহুপঁহু শব্দ করে। কে কার শব্দ শোনে,তখন তো আবেগাপ্লুত থাকে খালেকরোজিনা। 

রোজিনার বিয়ে হয়েছিল এক বছর আগে এবং বিয়ে হওয়ার পরপরই স্বামী বিদেশে পাড়ি জমায়।

   তবে  বিয়ে হওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় রোজিনার স্বামী তালাক দিয়ে,  বিদেশ  থেকেই তালাকনামা পাঠিয়ে দেয়।  অভিযোগ ছিলো, রোজিনার সাথে  তার খালাতো ভাই খালেকের  সম্পর্ক রয়েছে। বাজ পড়ে রোজিনার বাবা-মা ‘র মাথায়। কি হতি কি হয়ি গেলো-রে!

 নীরবে ফুপিয়ে ফুপিয়ে  কান্নাকাটি করলো কয়েক দিন। তারপর রোজিনার মা-বাবা সম্মানের ভয়ে,চক্ষু লজ্জায় গোপনে মেয়েকে  ৪/৫ কিলোমিটার দূরে  মধুখালি  গ্রামে, নানির কাছে পাঠিয়ে দেয়।

নানির বাড়ির এলাকার অথবা  বাবার বাড়ির এলাকার পাড়াপড়শিরা বিষয়টি তেমন কেউ যেন, না জানে । সেভাবেই পাঠিয়ে দিয়েছে । তবে  জানলেও,বিষয়টা নিয়ে তেমন কেউ  মাথা ঘামায় না। 

 সুযোগ বুঝে খালেকও নানির বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করে। তবে একটি মাত্র ঘর থাকায় খালেক-রোজিনার প্রেম বিনিময় হয় গোপনে রাতে,ঘরের পিছনে ; কাণ্টায়। 

 নানি বলে,কতো বড়ো ডেকরা, ছুড়িডারে রাইখি যাওয়ার পরপরই তুই- চইলি আইলি, আমার কাছে আইসি থাকতি লাগলি! 

ক্যান থাকিস, তা আম্ বুঝিনা,-বুঝি; বুঝিনি ও ডেকরা! আমারও যৌবন ছিলো-রে।

থাক,দুমুঠো ভাত তো কেউ দিত্ চায় না। তুই তো নানিডারে খাওয়াইসি, ভালোমন্দ খোঁজ নিস্। ঠোঁট নড়িয়ে বিড়বিড় করে বলে আর বুকড়ি দাঁতে হাসে।

 বুড়িকে  সকলেই হাজেরা নানি বলে।

 বুড়ি নানির সংসারের দায়িত্ব খালেক নিজ কাঁধে নিয়েই চলে। সারাদিন ভ্যান চালায়। সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরে। একটা ধাড়ি ছাগলও কিনেছে। হাজেরা সে ছাগলটি রাস্তার ধারে অথবা খোলা মাঠে বা কোনো ঘাসওয়ালা মাঠে লম্বা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। ছাগল ঘাস খায় ঘুরে ঘুরে। মাঝে মাঝে ভ্যাঁ ভ্যাঁ উচ্চস্বরে ডাকে। হাজেরা তার নাতি খালেককে কয়েকদিন ধরে বলছে,ও ডেকরা ছাগলডা খারাইয়িসে,পাঠা দেখাতে হবে। খালেক দেকাবুনি,উচ্চারণ করে ভ্যান নিয়ে বিড়ি টানতে টানতে  রাস্তার দিকে চলে যায়। রোজিনা উচ্চস্বরে খিলখিল করে হাসে। নানী কাইত হয়ে ঘাড় বাকা করে নাতনির দিকে তাকিয়ে বলে,তোর তো পাঠা লাগছে না; দাঁড়া ব্যবস্থা করছি, বলে হাতে থাকা লাঠিতে ভর দিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে।

( ২)

 এলাকার খুব পরিচিত মুখ হাজেরা বিবি বা বুড়ি নানি।

হাজেরা বিবি যৌবনে গান-বাজনা পছন্দ করতো। প্রতিবেশীদের বিয়ে বাড়িতে গিয়ে একাই মাতিয়ে রাখতো। খুব নাচতেও পারতো,চিৎকার করে গলা চড়িয়ে গানও করতে পারতো। তাই বিয়ের পূর্বরাত থেকে, কয়েকরাতে বিয়ে বাড়িতে ধুমধাম করতে হাজেরার ডাক পড়তো।

কুচি করে মাজায় শাড়ি গুঁজে, নেচে উঠতো বিয়ে বাড়ির উঠানে ” দুলা আইলো ময়নারে…” 

“সাজো সুন্দরী কন্যা সাজো বিয়ার সাজে”.. 

“মলিন কেন মুখখানি মরো কেন লাজে”

 ” বরতে আইলো বরনি কন্যা”….” ইত্যাদি গানেগানে  রাতভর আনন্দ দিতো বিয়ে বাড়ির মানুষ এবং প্রতিবেশীদের। 

একবার দক্ষিণ পাড়ার মণ্ডল বাড়ির মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান। যথারীতি ডাক পড়ে হাজেরা বিবির। শরতের শেষ দিকে এবং হেমন্তের আগমনে আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক ছিলো।  আকাশে নতুন ঝলমল চাঁদ আলো ছড়াচ্ছিলো। দূরে পুজা মণ্ডপে  মাইকে গান বাজতেছিলো।

 হাজেরা বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলে বেশ সাড়া পড়ে যায়, নানি আইছে-রে নানি।

 বিয়ের গান গাইতে গাইতে উঠানের মাঝখানে  একজন পুরুষ হাজেরার  সাথে নাচতে নাচতে গান গাওয়া শুরু করে। চারদিকে প্রতিবেশী ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হৈহৈ হৈহল্লা আনন্দ শুরু হয়ে যায়।  মণ্ডল বাড়িরই নিয়মিত কাজ করা মুনিশ ছিলো  মকবুল। মকবুলের সাথে হাজেরা বিবির নাচ যেন যাত্রা প্যান্ডেলের সদৃশ।  এদিকে প্রতিবেশী ও উপস্থিত  সদস্যরা  আনন্দে মাতোয়ারা,  শুরু করে দেয় দোল খাওয়া, মধ্যবয়সী মেয়েরা মুখে আঁচল দিয়ে হাসিমুখে দেখতে থাকে । 

তবে বাঙালিরা সমালোচনা করতে ভালোবাসে। ভালোবাসে অপরের সমালোচনা করতে। এখানেও ব্যতিক্রম কিছু দেখা যায়নি।

শুরু হয়ে যায় গুনগুন এবং কানাঘুষা, কি মিনসে রে! উমা, হাজেরার হাত ধইরিও নাচছে!

 উপস্থিত মুরুব্বিরাও মুখ আঁচল দিয়ে ঢেকে হাসতে থাকে, একে অপরের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে সমালোচনা করতে থাকে অথচ মনে মনে রোমাঞ্চকর দৃশ্যটুকুও উপভোগ করতে থাকে।

সারারাত চলতে থাকে আনন্দ উৎসব।  মকবুলের সাথে গান গাইতে গাইতে, রাত কোনদিক দিয়ে চলে যায়, হাজেরাসহ প্রতিবেশীরা কেউই টের পায়নি। এ পাড়ায় এই প্রথম পুরুষ এবং মেয়ের একসাথে হাত ধরাধরি করে নাচগান! আহা! 

রোমাঞ্চকর দৃশ্য। সিনেমার মতো লাগে প্রতিবেশী ছেলেমেয়েদের কাছে। তারপর দিন শেষে রাতে মণ্ডলের মেয়ের বিয়ে হয়। পালকি করে উহু উঁহু উহু সুর তুলে মেয়েকে নিয়ে যায়।

মণ্ডল বাড়িরসুখ দুঃখের সাথে মিশে থাকা মকবুল, মণ্ডলের কাছে আবদার করে,  ভাই আমি হাজেরা-রে বিয়ে কইরবু।

মণ্ডল অবাক হয়ে বলে বলছিস কী, হাজেরা রাজি হবে তো?

মকবুল রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,হবেনি হবেনি।

মণ্ডল হেসে বলে,তাইলে তলে তলে তল মাইরি ফেলেছিস!- যা কাজে যা, বিয়ে হবেনি।

মকবুল ছোটো বেলা থেকে এবাড়িতে কৃষাণের কাজ করে আসছে। মণ্ডলও ভাবে মন্দ হয় না,একজনের বদলে দু’জন কাজের লোক পাওয়া যাবে, হাজেরাও বেশ কাজের মেয়ে। 

ফিরিনি করতে মেয়ে জামাই মণ্ডল বাড়ি এলে,একই সাজগোছ খাওয়াদাওয়ার বদৌলতে  হাজেরা এবং মকবুলের বিয়ে দিয়ে দেয় মণ্ডল।

 সেই সাথে  দুজনকে নিজ বাড়িতে রেখে দেয়। গৃহস্থ বাড়ির বারান্দার পাশের ঘরটায় থাকতে দেয় মকবুল ও হাজেরা বিবিকে। 

দু’জন মণ্ডল বাড়িতে সারাদিন কাজকাম করে এবং রাতে আনন্দেই থাকে। মাঝে মাঝে গানও করে গলায় গলা মিলিয়ে 

“বাজনা বাজে পটকা ফোটে কমলারো বিয়ে…”

ভোরে উঠে গরু মহিষ খেতে দেওয়া, গোয়ালঘর পরিস্কার করা, থালাবাসন ধুয়ে রাখা সবই করতে থাকে। মণ্ডল বাড়িটাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে। এভাবেই কেটে যায় বছর তিনেক। হাজেরা জমজ মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। সে মেয়েদের বয়সও দু’বছর হয়ে গেছে।  মা’র আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায়। হাজেরা বিবিও মেয়ে দুটিকে কোলে পিঠে নিয়ে গৃহস্থ বাড়ির সব কাজ সামলাতে থাকে। 

       

বর্ষার এক সন্ধ্যয় খবর এলো, মকবুল ঘাসের বোঝা মাথায় নিয়ে, আসতে আসতে রাস্তায় ট্রাকের ধাক্কায় মারা গেছে। ট্রাকড্রাইভার গতি হারিয়ে রাস্তার ধারে উল্টিয়ে খাদে পড়েছে, ট্রাকের নিজে ড্রাইভারও পড়ে রয়েছে। গ্রামের লোক,আশপাশের লোক দেখতে এসে ভীড় জমায়। পুলিশও খবর পেয়ে হাজির হয়। এভাবে হাজেরার বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি ঘটে। হাজেরা বিবি মেয়ে দুটিকে নিয়ে মণ্ডল বাড়িতে থেকে যায়। 

মণ্ডলের জীবনের অবসানের পূর্বে পশ্চিম পাশে রাস্তার ধারে হাজেরা বিবির বসবাসের জন্য কিছু জমি দিয়ে যায়। সেখানেই হাজেরা বিবি  মেয়ে দুটি নিয়ে বসবাস করতো। তারপর মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সে হলে, একদিনে দুটি ছেলের সাথে দুটি মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। ছেলে দুটির বাড়ি ৪/৫ মাইল দূরের গ্রামে। তারাও লেবার শ্রেণির মানুষ।  দিন তো নেমে থাকে না,চলতে থাকে নিজ গতিতে। সে গতির সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ জেনে অথবা না জেনে চলতে থাকে। 

 

( ৩)

তারপর শুরু হয় হাজেরা বিবির দু’সন্তানের  নতুন প্রজন্মের জীবন ধারা। নাতিনাতনিরা আধুনিক মানসিকতা নিয়ে চলছে। একজনের নাতির নাম খালেক অপর নাতনির  নাম রোজিনা। 

আশি  এবং নব্বইয়ের মাঝামাঝির ঘটনা। 

ততদিনে, দিন বদলিয়ে গেছে, রাস্তার উন্নয়ন হয়েছে। মাঠে পানি সেচের ব্যবস্থা হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ এর আলোয় আলোকিত হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে আলোর ঝলকানি এসে পড়ে রাস্তাঘাটে। 

পাড়াগাঁয়ের জীবনও বদলে গেছে। অসংখ্য পরিবার থেকে ছেলেমেয়েরা বিদেশ গেছে। কেউ কেউ যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ যাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে রেখেছে দালালদের হাতে । অপরদিকে আর্মি পুলিশের চাকরিতে গেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা। পাকা ঘরবাড়ি হচ্ছে। তবে হাজেরা বাড়ি বাড়ি কাজ করে তেমন কিছু করতে পারেনি। মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি নিজেদের মতো থাকে। কখনও খোঁজ নেয়, কখনো নেই না। ইতিমধ্যে নাতি নাতনির আগমনে হাজেরা বিবি মনে মনে খুশীই হয়,

 ভিটিডায় বাতি দেয়ার লোক আইলু,আর যাতি দেবো নানে। জোড়া বাইন্দি দিবুনি। মাঝে মাঝে দু’মেয়েকে চলতি পথের লোক দিয়ে খবর পাঠায়,ও বাবা আমার রুশিয়াকে আর খুকিরে আসতি বুলিস দিন।

পথের লোকগুলো হাসতে হাসতে ঘাড় নাড়ে, আচ্ছা নানি।

হাজেরা বিবি পথ চেয়ে থাকে,কবে যে আসবিনি?

খালেক ভ্যান নিয়ে বাড়ি আসে। হাজেরা বিবি নাতনিকে এগিয়ে দেয়, যা খাইত দিগা।

যাইছি নানি, বলে রোজিনা খালেকের সামনে যায়। খালেক  পকেট থেকে বিড়ি বের করে ম্যাচ জ্বেলে  ঠোঁটে দিয়ে ধরায়,ধোঁয়া উড়ে আকাশের দিকে যায়।

রোজিনা ওড়না দিয়ে ধোঁয়া সরাতে চেষ্টা করে, উহু গন্ধ। 

খালেক বিড়ি টেনে মুখের ভিতর ধোঁয়া আটকিয়ে রেখে রোজিনার মুখের দিকে ছেড়ে দেয়। রোজিনা চিৎকার করে, ও নানি?

হাজেরা বিবি বোকড়া দাঁত বের করে হাসে শুনছি লো।

 রোজিনা বলে,দ্যাক্ নানি তোর নাইত ছেলি ধুমু মুখের দিকে দেচ্ছে। 

হাজেরা বিবি না তাকিয়ে বলে,দিক্ তুইও খা।

খালেক হাসতে হাসতে ভ্যানের হ্যান্ডেলে থাকা বাজারের ব্যাগ রোজিনার হাতে দেয়।

 

(৪)

হাজেরা বিবি অপেক্ষা করে দু’মেয়ের জন্য। কবে আসবে?

রোজিনা সংশয়ে ভয়ে ভয়ে দিন কাটায়। তবু রাত হলে খালেকের ইশারা এড়াতে পারে না। 

রোজিনা খালেককে বলে, কবে বিয়ি করবা?

খালেক বলে কুইরবুনি কইরবুনি। রোজিনা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে, না বিয়ি না করলি আমি থাইকবু নানে।

খালেক জড়িয়ে ধরে বলে,চ -চল দিন; আপত্তি করলি হয়?

– হয়তো তো,আমার যে… 

-কী তোর?

– বুলতি পাইরবু নানে। আম্ নানির কাছে যাচ্ছি। 

-ক্যান? 

-আমার বুমি বুমি লাগছে।

হাজেরা বিবি ঘর থেকেই শোনে এবং চিৎকার করে ওঠে। ওরে ডেকরা, বুইলছিলাম না,পেট বাইদি যাবিন্?

খালেক দূরে সরে যায়। রোজিনা নানিকে জড়িয়ে ধরে, আমার কী হবিন নানি?

-দাঁড়া,সকাল হোক। কতো যে খবর দিনু মেয়ে দুডোকে, তাও আইলু না। সকালে আমি না-হয়ই যাবুনি।

খালেকের মাথায় দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। সকালে ভ্যান নিয়ে দূরে ভাড়ায় যেতে হবে। কন্টাক্ট ভাড়া, সাত’শ টাকা অগ্রিম নিয়েছে। কুষ্টিয়া সদর  হাসপাতালে রুগী নিয়ে যেতে হবে।  ওদিকে মা-খালা আসবিনে দুপুরের দিকে। অনুমান করতে থাকে। ঘুম আর হয় না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে সকাল হয়ে যায়।  রুগীর বাড়ি থেকে বারবার খবর আসে,ওই খালেক,এখনো আসিসনি। তাড়াতাড়ি আয়।

অথচ বাড়িতে  এখনো খাবার তৈরি হয়নি। রোজিনাও রাতভর ঘুমাতে পারেনি। কী করতি কি হয়ি গেলো। মা-খালাকে কী বলবে?-রোজিনার মাথায়ও দুশ্চিন্তা। 

খালেক জোরে জোরে চিৎকার করে, যা আছ্ তাই দে নানি; আমার ভাড়ায় যাতি হবে।

রোজিনা পান্তাভাত আর পেঁয়াজ-কাঁচাঝাল নিয়ে এসে সামনে দেয়। রোজিনার শুকনো মুখ দেখে খালেকেরও চিন্তা বাড়তে থাকে। নিজে না খেয়ে  বলে,তুই খাইস; আম্ বাজার থিকা খাইয়ি নিবুনি। বলতে বলতে ভ্যানে উঠে পড়ে। রোজিনা তাকিয়ে থাকে। বুকটা ধুকধুক করতে থাকে রোজিনার। মা আসলি কী বুলবুনি?

(৫)

 

গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। অপেক্ষা করতে থাকে খালেকের মা এবং খালা। খালেক তো বাড়ি ফেরে না। বাড়িতে মোরগ ছিলো সেটাকে জবাই করেছে হাজেরা বিবি।  রান্না করতে বসেছে রোজিনার মা। খালেকের মা রেগে আছে,দুআজবারি মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ি দেবো ক্যান? কিবা আছে রোজিনার মা’র? দুই বোনের মধ্যে ফারাক হতে থাকে। মনে মনে কতচিন্তায় হয়? বাস্তবে উল্টোটাও ঘটে। হ

এমন ধরনের চিন্তা করতে থাকে।  অথচ রাত যতো বাড়ে ততই চিন্তা বাড়ে,ছেলেডার কিছু হইলু নাকি? 

মন নরম হতে থাকে।  এদিকে হাজেরা বিবি বিয়ে পড়ানোর জন্য মোল্লা ডেকে এসেছে।  তিনিও চলে এসেছে।  আসেনি খালেক। হঠাৎ দূর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। কান্নার শব্দ স্পষ্ট হতে হতেই অস্পষ্ট হতে থাকে।  দূরে কোনো গাড়িতে বা ভ্যান থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে আবার শব্দটা যেন দূরে চলে যায়। খালেকের মা মনে মনে আরো নরম হয়, আমার খালেক ফিরে আসুক, রোজিনার সাথেই বিয়ি দিবুনি,আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখুক।

বাড়ির তো গেট বা দরজা নেই। খোলা বাড়ির সামনে একটা বেড়া দেওয়া রয়েছে।  মনে মনে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে করতেই, খালেক কিড়িংকিড়িং বেল বাজিয়ে বাড়িতে আসে। ভ্যানটা এক পাশে রাখতে রাখতে বলে,ওই পাড়ার মালেক চাচার মা-ডা কে নিয়ে গিয়িলাম হাসপাতালে।  ডাক্তার এ-তো দেকলু,তাও মইরি গেলো। মরা নিয়ি আনতি দেরি হয়ি গেলো।

খালেকের মা ছেলের কাছে গিয়ে আঁচল দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দেয়।

 

 

আনোয়ার রশীদ সাগর
কথাসাহিত্যিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top