শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা
কামরুল ইসলাম এর একগুচ্ছ কবিতা
শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা
কামরুল ইসলাম এর একগুচ্ছ কবিতা
কালকেউটের অস্থির বিষ
শীতের চাদরসহ তুমি নেমে গেলে হাড়ের গভীরে, চাঁদরাতে।
আমার নিটোল অস্থিমজ্জায় সাঁতার কেটে কেটে
নগ্ন দেহখানি ছুঁড়ে দিলে হৃদপিণ্ডের আলো-আঁধারির দেশে
সেখানের খোলা হাওয়ায় রজনীর গুপ্ত গানের সুর ওড়ে
তোমার শরীর যেন কারো কোনো হারানো শ্রাবণ
সপ্রাণ মেঘের দেয়ালে টাঙানো তার সহজিয়া সুর–
রাত ও জোনাকির প্রেমের গুঞ্জন একটি বিন্দুকে ঘিরে
জমে উঠতে থাকে, অঝোরে বৃষ্টি নামছে নির্জন সাঁকোর ওপারে
তুমি সারিয়াকান্দির বিলের কিনারে আলো খোঁজ,
তোমার সর্বসত্তায় জেগে ওঠে কালকেউটের অস্থির বিষ–
কারো পদশব্দের আড়ালে কান পেতে আছে সময়ের
ঘনত্ব ও আলো-অন্ধকার, মীন ও মৃগয়ার দিকে বিষহরির পালা–
এই নিবিড় টান নিঃশব্দে সঞ্চারিত হতে থাকে নিঃসঙ্গ পথিকের
দগ্ধ সত্তার গভীরে, জগতের অনন্ত লীলায়–
সন্ধ্যা নামছে চারদিক আলো ছড়িয়ে
নদীটি পার হয়ে কিছুদূর যেতেই ভুলে গেলাম নদীর নাম।
মাটির রাস্তা,
বামদিকে কিছু বুনো ফুল ফুটে আছে,
পাড়ার লোকেরা কেউই এর নাম জানে না।
অতঃপর ভুলে গেলাম কোথায়, কোন গ্রামে যাব
ডান দিকের কুঁড়েঘরে ছেলেমেয়েরা পুতুলের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত
আমার সফর না-ফেরার রঙে ক্রমশ ফুটে উঠছে যেন
এদিকে লেবুগাছের কচি কচি পাতা ও ডালের মধ্যে
নেমে আসছে ক্যামোমাইল দিন
বসন্তের আঁচলের ঘ্রাণে বোঝা যায়– অমাবশ্যার ডেরা থেকে
বেরিয়ে আসছে ঢেউসিরিজের নৌকা–
আমার না-ফেরা পথের মাথায় ভিড় করে আছে পরান্মুখ হাওয়া–
আন্দাজ করি, তুমি নদীর ঘাটে গোছল সেরে বাড়ি ফিরছো
তোমার ভেজা চুলে লেগে আছে ডুবোচরের স্নিগ্ধ রেকোয়েম
সন্ধ্যা নামছে চারদিক আলো ছড়িয়ে…
দুপুর বেলাটা আমি অন্ধ শ্রমণের মতো বাঁচি
দুপুর বেলাটা আমি অন্ধ শ্রমণের মতো বাঁচি।
অরূপের নেশায় ডানা মিলেছে কয়েকটি গাংশালিক
ওদের নিঃসঙ্গ পালকের নোটেশনগুলো
অলস বাতাসের আঁকশিতে বিঁধে
ঝরিয়ে যায় নদীপাড়ের সামন্ত দিন, জমিয়ে রাখা উৎসব
আমার ক্লান্ত কোষের মাইট্রোকন্ডিয়ায় ছায়া পড়ে তার।
দুপুরের অদৃশ্য চাঁদতারার ইংগিতে এই অধরা সন্ন্যাস, আমি
অতীতের হাড়হাড্ডির ভেতরে তোমার রংতুলির গন্ধ পাই–
একদিন এক সুরেলা নৌকোয় ধীরে ধীরে বৈঠা ঠেলে
জলে ডোবা আমনখেতের রূপের আড়াল দিয়ে
দেখিয়েছি তোমাকে তরঙ্গের দেশ, যেখানে তুমি মাকড়সার
নৈঃসঙ্গ্যের গভীরে মৃত্যু ও মাতৃত্বের ছায়া দেখে
ভেজা হাওয়ায় সরল মেঠোপথ এঁকে ডুব দিলে জলে–
তোমার ছায়ার গভীরে আমার অপ‚র্ণ কুটির
সাঁজবাতি জ্বেলে বসে আছে, যেভাবে বিলের জলে প্রতিটি দুপুর
কৈমাছের সাঁতার দেখে দেখে বুড়ো হতে থাকে
দুপুর বেলাটা আমি অন্ধ শ্রমণের মতো বাঁচি,
দুপুর পেরিয়ে গেলে দ্বিধান্বিত বিকেল দেখি তোমার মুখে
তখন আমি প্রজাপতি মনে সাঁতরে যায় সাটামাটা ইহকাল–
গহীনে বেঁকে যাচ্ছে জগৎ
স্বপ্নের ভেতরে কাঠকয়লা পুড়ছে, আর
সেই ঐন্দ্রজালিক ধোঁয়ার ভেতরে তুমি স্মিত হাসছো,
গহীনে বেঁকে যাচ্ছে জগৎ
মুছে যাওয়া স্মৃতির পাড় ধরে গুণ টেনে চলেছে
ধোঁয়ার কুণ্ডলী, কাদায় ডুবে আছে তোমার মুখ
মধ্যরাতের ঝুম বৃষ্টির মায়ায় তোমার ছাইভষ্ম মন
সন্ধ্যা পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে অরণ্যে–
জীবন এক আশ্চর্য নির্জন শহর
রাত নামলে বোঝা যায় ল্যাম্পপোস্টের অতল গভীরে
অদ্ভুত সব কান্নার ধ্বনি ডানা মেলে উড়ছে
গাছের অদৃশ্য বাঁশিরা ফুটে উঠুক
আমাদের সব কলরবই বেঁচে থাকে
বাতাসের গোপন কোঠরে,
চিৎকারে কিছুটা শীত মিশিয়ে দিলে
সেমেট্রির নির্জনতায় পাখিদের হাসি খুঁজে পাবে,
এরকম ভাবতে ভাবতে মনে হলো–
এই নিঝুম জেটিতে
আজ আর কোনো জাহাজ এসে ভিড়বে না
অসুখের দিকে ফুটে আছে
বারবণিতার ঠোঁটের মতো নিঃসঙ্গ চাঁদ
মাতালের হারানো জীবন কেঁদে ওঠে আলপথে
আকাট তিমিরে চড়ে ঘুরে গেল দীর্ঘশ্বাস।
এবার তাহলে মন্ত্র পড়ো,
আঘাটার স্মৃতির দিকে ধুলো ওড়াও,
গাছের অদৃশ্য বাঁশিরা ফুটে উঠুক দুনিয়া কাঁপিয়ে–
কামরুল ইসলাম
জন্ম : কুষ্টিয়া জেলার ফিলিপনগর গ্রামে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। সর্বশেষ রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিশেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন দ্বিভাষিক কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ছোটগল্পকার। নব্বইয়ের দশকে চূড়ান্তভাবে কবিতার জগতে প্রবেশ। এ পর্যন্ত ১৩ টি কবিতার, ৬টি প্রবন্ধের ও ১টি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। তার কবিতা দেশ-বিদেশের নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ২৫ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশ্বকবিতায় অবদানের জন্য বেশকিছু অ্যাওয়ার্ডস ও সম্মাননা পেয়েছেন।
কাব্যগ্রন্থ: দ্বিধাান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯), ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প ( ২০০৬ ), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮ ), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল(২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া(২০১৪), দীর্ঘশ্বাসের সারগাম (২০১৬), বিহঙ্গখচিত লন্ঠন (২০১৭), নির্বাচিত কবিতা (২০১৯), কিছুটা ভোর, বাতাসের গদ্যসহ (২০২০, কোলকাতা), আগাছার ইন্দ্রজাল (২০২১), গোপাল সাঁইয়ের কবিতা ( ২০২৩)
ছোটগল্প: বিনির্মিত ভাসান , জল থেকে জলে ( ২০২০)
প্রবন্ধগ্রন্থ: কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯)
রবীন্দ্রনাথ: বিচিত্রের দূত (২০১৩)
কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)
কবি ও কবিতা: কবিতার আলো ও আঁধার (২০১৮)
রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ (২০২১)
কবিতার রংরক্ত নিমগ্ন করতল (২০২৪)
Edited book : Green Fogs : A Collection
of Contemporary Bangla Poetry (2017)