শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬। গল্প:গোলাপের রঙ লাল-প্রিন্স আশরাফ

Spread the love

শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬

গল্প: গোলাপের রঙ লাল
প্রিন্স আশরাফ

শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬

গল্প

গোলাপের রঙ লাল

প্রিন্স আশরাফ

অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাড়াল রাতুল। এ সময় অফিসফেরতা মানুষের প্রচন্ড ভিড়। বাসে বাসে বাদুড় ঝোলা হয়ে মানুষ ঝুলছে। বাকিগুলো গেটলক। সিটিং সার্ভিস। ব্যাচেলার বলে তার অবশ্য অতো তাড়া নেই। আর ইচ্ছে করলে টুকটুক করে হেটেও বাসায় ফেরা যায়। অফিস থেকে বাসার দুরত্ব আহামরি বেশি নয়।

এই সময় বাচ্চা ছেলেটা রাতুলের পিছু লাগল। ন’দশ বছর বয়স। আগারগাওয়ের মোড়ে এদেরকে প্রায়ই চোখে পড়ে। একগাদা টাটকা লাল গোলাপ ফুল নিয়ে অনুনয় বিনয় করে। টার্গেট থাকে জ্যামে অথবা সিগনালে দাড়ানো যাত্রীবাহী বাসগুলো। ভীড়ের দাপটে বাসের ভেতরে উঠতে পারে না। জানালা দিয়েই হাকে। ফুল ন্যান স্যার। ফুল। টাকটা লাল গোলাপ স্যার। ম্যাডামকে দিয়েন। মাঝে মধ্যে তার মত দুএকজন ভদ্রস্থ পথচারীকে দেখলেও পিছু পিছু ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। ফুল ন্যান স্যার। আপায় খুশি হইব।

রাতুল বাচ্চা ছেলেটার কথা শুনে হেসে ফেলল। আজকালকার আপারা গোলাপ ফুলে খুশি হয় না। তাই তা বুকের রক্তগোলাপ হলেও। ওর চেয়ে নাম্বারে ব্যালান্স ভরে দিলে খুশি হয়। একজনের ব্যালান্স দিয়ে আরেকজনের সাথে প্রেম করতে পারে। ওও আরেক রকমের ব্যালান্স। ডাবল ব্যালান্স।

রাতুলের হাসিতে ছেলেটা আরো প্রশ্রয় পেল। না হলে হয়তো অন্য কাস্টমার বা বাসের পিছনে দৌড়াতো। ছেলেটা পিছু পিছু আসতে লাগল। সাথে সাথে ফুলের কতোরকমের প্রশংসা করতে লাগল। লালগোলাপের যে এত প্রশংসা হতে পারে তা জানলে নিশ্চয় ছেলেটাকে টিভির লালগোলাপ অনুষ্ঠান থেকে ডাকত। ছেলেটা এবার প্রশস্তি বাদ দিয়ে আকুতি শুরু করল, ‘এট্টা ফুল ন্যান স্যার। আইজা এট্টাও এহনও বেচবার পারি নাই। না খাইয়া থাহন লাগব। এট্টা ন্যান স্যার। এহন আর কেউ ফুল কিনবার চায় না স্যার। আপনেরা না কিনলে আমরা বাচুম কেমনে। আমরা বাচুম। আপাও খুশি হইব।

রাতুল হেসে বলল, ‘খুশি যে হবে, আপাই তো নেই।’

ছেলেটা প্রথমে কথাটা বুঝতে পারল না। তারপর বুঝে উঠে বলল, ‘নাই তো কি হইছে। হইব স্যার। নেন। এহন থাইকা নিতে থাকলে আপারে দেওনের প্রাকটিস হইব স্যার।’

রাতুল বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল, ‘একেবারে নেই যে তা ঠিক না। তবে তাকে লালগোলাপ দেয়ার মত সাহস এখনও সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি।

‘এই গরীবে কইতাছে যারে চাইতাছেন তারে পাইবেন স্যার। তারে এই লালগোলাপ ফুলটা দিবেন স্যার। দিলেই পাইবেন স্যার।’ ছেলেটা ফুলের গোছা থেকে একটা টকটকে লালগোলাপ টেনে বের করল।

ছেলেটার হাতের ফুলের দিকে তাকাল রাতুল। আধফোটা বড় রক্তগোলাপ কিরকম ওদ্ধত্য নিয়ে  তাকিয়ে আছে। ঠিক সেই মেয়েটার মতই। ওদ্ধত্য আর সতেজ। পুরো ফোটেনি গোলাপটি। কিন্তু এমন ওদ্ধত্য আর আর ডাটো ভঙ্গি আর পাপড়ির গায়ের বিন্দু বিন্দু পানির ফোটা ঠিক আরেকজনের কথা মনে করে দেয়। তাকে দেখলেও ওরকম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়।

ছেলেটা বুঝে গেছে রাতুল ফুলটা নেবে। লম্বা ডাটি আর দুটো পাতাশুদ্ধ রক্তগোলাপটা সে রাতুলের হাতে গছিয়ে দিল। রাতুল ফুলটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘দাম কতো এটার?’

‘দশ টেহা। আপনি আট টেহাই দ্যান স্যার।’

রাতুল দশ টাকাই দিল। বলল, ‘পুরোটাই রাখ।’

টাকা পেয়েই ছেলেটা রাতুলের দিকে না তাকিয়েই নতুন খদ্দের ধরতে গেল। রাতুল হাসল মনে মনে, তাদের অফিসের চরিত্রও এই ছেলেটার মতো। বিজনেস শুরুতে অনেক আদর আপ্যায়ন। কথা খরচ। বিজনেস শেষ তো সব ল্যাটা, সব সম্পর্ক চুকে গেল। কর্পোরেট। আজকাল কি সব সম্পর্কই এরকমই গিয়ে দাড়ায়নি? প্রেমের সম্পর্কও? লেনদেন চুকে গেলেও আর কোন সম্পর্ক থাকে না। না হলে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক চুকে যাওয়ার পরে মেয়েরা সে নাম আর মুখেও আনে না। যেন ভাসুরের নাম।

‘স্যার, ওর কাছ থাইকা ওই ফুল লইছেন ক্যান?’ বাচ্চা গলায় রাতুলের চমক ভাঙল। আরেকটা ফুলওয়ালা ছেলে তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। এতক্ষণ দুরে দাড়িয়ে ওদের কেনাবেচা দেখছিল। ওই ছেলেটা সরে যেতেই এসেছে।

রাতুল ভুরু কুঁচকাল। এর পাল্লায় পড়ে আবার আরেকটা ফুল কিনতে হবে নাকি? ‘কেন কি হয়েছে?” কিছুটা ধমকের স্বরে বলল।

‘হ্যার ফুলে দোষ আছে স্যার।’ ছেলেটা একটু দুরে দাড়িয়ে বলল। দুর থেকে ফুল বেচা ছেলেটাও তাদেরকে দেখছে।

‘ফুলে দোষ? বলিস কি? এতদিন শুনে আসছি ফুল নিষ্পাপ পবিত্র। আবুল ভাইয়ের চরিত্র/ ফুলের মত পবিত্র।’

রাতুলের মুখে শ্লোগানের ভঙ্গিতে শ্লোগান শুনেও ছেলেটা হাসল না। চোখমুখ শক্ত করে বলল, ‘জ্বে স্যার। দোষ আছে। নেছেন যখন বুঝবার পারবেন।’

ছেলেটার কথায় রাতুল বেশ মজা পেল। কেমন রহস্যের গন্ধ। ‘কি দোষ আছে তা তো বললি না। খালি দোষ আছে। দোষ আছে।’

‘হেইডা কব্বরের ফুল। হে কব্বর থাইকা ফুল টোকায়। খিরিছটানগোর কব্বর।’ ছেলেটা প্রতিবার কব্বর শব্দটার উপর এমন জোর দিলো যে কবর তার ভয়াবহ রুপ নিয়ে যেন হাজির হয়েছে।

রাতুল একটু চমকাল। কার মুখে যেন শুনেছিল কবরস্থান থেকে ফুল তুলে আনা হয়। যেমন লাশের চা বলে একটা কথা প্রচলিত আছে।

‘কবরস্থানের গাছের ফুল?’

‘না স্যার।’ ছেলেটা দুদিকে মাথা নাড়ল। ‘লোকে কব্বরের উপরে ফুল দিয়া যায়। হে হেইগুলান টোকাইয়া আনে। হে থাহেও কব্বরস্থানে। হের বাপমা বাড়িঘর কিচ্ছু নাইক্যা। কব্বরস্থানে হুইয়া থাহে আর কব্বরের ফুল টোকায়।’

রাতুল একটু অবাক হলো। ব্যাপারটা সত্যি নাকি? এটাও কর্পোরেট বিজনেস পলিসি। অন্যের পণ্য খারাপ। আমারটা ভাল। আমি এক নাম্বার। বাকি সব দুই নাম্বার।

রাতুল ছেলেটাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গেছে তা একটু পরেই জানা গেল। এই ছেলেটা ওর কাছে যেতেই ওই ছেলেটা ঝাপিয়ে পড়েছে এর উপরে। তারপর শুরু হলো ঝাপটাঝাপটি। দুজনেরই হাতের রক্তগোলাপের তোড়া মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। ওরা দুজনও   রাস্তার পাশে ঝাপটে ধরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কয়েকজন দাড়িয়ে আবার তাতে বেশ উস্কানি দিচ্ছে।

রাতুল ছাড়ানোর জন্য এগিয়ে গিয়েছিল। তার আগেই ছাড়িয়ে গেল। পরের ছেলেটার বাপ চলে এসেছে। সে এর ওর গালে চড় দিয়ে ছাড়িয়ে দিল। দুজনে তখনও ফুসছিল। রাতুল বুঝল, কর্পোরেট বিজনেসের প্রতিযোগীতার ব্যাপারস্যাপার।

হাতে একটা ফুল থাকলে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। মনে হয় সবাই তার দিকে তাকিয়ে দেখছে। বিশেষত তরুণীদের দেখলে লজ্জায় অধোবদন হতে হয়। বাসায় নিয়ে গিয়েও কোন লাভ নেই। সে ব্যাচেলর ফ্লাটে থাকে। তার ফ্লাটে ফুল রাখার কোন ফুলদানি পর্যন্ত নেই।

রাতুল রক্তগোলাপটার দিকে আরেকবার তাকাল। পথের পাশে ফেলে দিতে মন চাইছে না। ফুলটার যেন কোন একটা আর্কষণ আছে। আকৃষ্ট করার ক্ষমতা আছে। কেমন সতেজতা আর আকুলতা নিয়ে অর্ধপ্রস্ফুটিত হয়ে আছে। ফুলটার দিকে তাকালেই রিমির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

রাতুল বিষন্ন মনে হাটতে লাগল। আর কিছুদুর গেলেই তার বাসা। কিন্তু এখন এই ভরাসন্ধ্যায় একলা বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। কোন কিছুতেই মন ভরছে না। প্রিয় নারী যখন অন্যের বাহুডোরে তখন কোন কিছুই ভাল্লাগে না। কেমন যেন আত্মহত্যার ইচ্ছে জাগে। সন্ধ্যের বিষন্নতার নিজস্ব কোন সুর বোধ হয় আছে। সেই সুর যেন পরপারের অজানা কোন উৎস থেকে ভেসে আসে।

রাতুল বাসার পথ ছেড়ে অন্য পথে হাটতে লাগল। যেন ফুলটাই তাকে জম্বির মত পথে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার নিজের পথ চলার কোন ইচ্ছে অনিচ্ছা নেই। কবরের এই রক্তগোলাপ কি তাকে শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যিই আত্মহত্যার পথেই ঠেলে দেবে।

রেলক্রসিংয়ের কাছে এসে থমকে দাড়াল রাতুল। আরেকটু হলেই ট্রেনের নিচেই কাটা পড়তো সে। এতটা তন্ময় হয়ে হাটছিল যে ট্রেনের দুরাগত শব্দ তার কানের পাতা ছুয়ে যায়নি।

ফুলটার দিকে আরেকবার তাকাল রাতুল। ফুলটাকে দেখলেই রিমিকে কেন মনে পড়ছে। কেন রিমির কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। ওর কাছে যাওয়ার কোন অধিকারই তো তার নেই। রিমির সংসারে অযথা ঝঞ্চাট ডেকে আনার কোন মানে হয় না।

জ্বালানি তেল আর সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ায় সিএনজিতে একবারে অনেকখানি টাকা খসে যাবে। কিন্তু এত টাকা টাকা করে কি হবে? আর এই রক্তগোলাপ হাতে নিয়ে সন্ধ্যের এই ভিড়ের বাসে চড়া যায় না। গোলাপ চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে।

সিএনজি থেকে রিমিদের ফ্লাটের সামনে যখন নামল তখন সন্ধ্যে পার হয়ে রাতের অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বাসায় উঠতে যেয়েও থমকে গেল রাতুল। এখন যদি রিমির মাথা গরম হ্যাজব্যান্ড আফতাব বাড়িতে থাকে? ব্যবসায়ী মানুষ। কখন যায় কখন আসে কোন ঠিকঠিকানা নেই। এভাবে হাতে ধরে ফুল নিয়ে যাওয়া যাবে না। ফুলটাকে আড়াল করে নিতে হবে। অবস্থা বেগতিক দেখলে ফুলটা না দিয়েই চলে আসবে সে।

রাতুল আশপাশের দোকানে চলে এলো। একটা মনোহরীর দোকান থেকে টাকা দিয়ে মাঝারি সাইজের একটা কাগজের প্যাকেট কিনল। তাতে গোলাপটার কোন ক্ষতি না হয়ে অনায়াসে আটকে যাবে।

কলিংবেল চেপে দাড়িয়ে রইল রাতুল। কারো কোন সাড়াশব্দ নেই। কেউ বাসায় নেই নাকি? ফ্লাটের লকগুলো এমন যে দেখে বোঝার উপায় নেই তালা দেয়া কিনা। পর পর তিনবার কলিংবেল চাপল। ভেতর থেকে এসে কেউ দরজা খুলল না। শেষমেষ চলে যাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কলিংবেল চেপে ধরে দাড়িয়েই রইল কিছুক্ষণ।

হঠাৎ করে দরজা খুলে গেল। রাতুল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পিছিয়ে গেল। দরজা খুলেই ওপাশ থেকে রণরঙ্গিণী ভঙ্গিতে খেকিয়ে উঠল, ‘কলিংবেলের বারোটা বাজাবে দেখছি। কি চাই?’ তারপর রাতুলকে চোখে পড়তেই লজ্জায় অধোবদন হয়ে গেল।

রিমির দিকে তাকিয়ে রাতুল চমকে উঠল। রিমিকে ঠিক রক্তগোলাপটার মত লাগছে। কোন বিচিত্র কারণে সে আজ টকটকে লাল শাড়ি লাল বøাউজ পরেছে।

‘ও তুমি? হঠাৎ? এসো ভেতরে এসো।’ রিমি পুরোপুরি দরজা খুলে দিল। ‘আমি ভেবেছিলাম, এতিমখানার ফকিরগুলো। পাশেই একটা এতিমখানা আছে। প্রায় চাঁদা চাইতে আসে। এতো বিরক্ত করে!’

রিমির পিছে পিছে রাতুল ড্রয়ংরুমে ঢুকল। ‘হঠাৎই এলাম।’ ‘তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো’ বলল না রাতুল। গুন্ডাটা ভেতরে আছে কিনা কে জানে?

‘আফতাব ভাই বাসায় আছে নাকি?’ ব্যাটাকে ভাই বলে ডাকতে রাতুলের বাধছিল।

‘উঁহু। এখনও আসেনি।’ রিমির রাতুলের সামনের সোফায় বসল। ‘আসবে। আজ আমাদের এক জায়গায় যাওয়ার কথা।’ রাতুলকে যে তাড়াতাড়ি বের হতে হবে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিল রিমি।

রিমির রক্তগোলাপের মত সাজসজ্জার কারণটা বুঝতে পারল রাতুল।

রিমি ইতস্তত করে বলল, ‘একটু বসো। আমি একটু ভেতর থেকে আসছি।’ রিমি উঠে দাড়াল, ‘তুমি যখন বেল চাপছিলে আমি বাথরুমে ছিলাম। সরি। তোমাকে ওভাবে বাইরে দাড়িয়ে থাকতে হলো।’ রিমি ভেতরের ঘরে যাওয়ার আগে বলল।

রাতুল বুঝতে পারল রিমিকে এত পবিত্র, ঠিক গোলাপটার মতই তাজা লাগছিল কেন। রিমি একটু আগেই গোসল সেরেছে। গোসলের পরে মেয়েদের শরীরে যে লাবণ্য ফুটে ওঠে হাজার টাকার বিউটি পার্লার সে সৌন্দর্য আনতে পারে না।

একটু বাদেই ফিরে এলো রিমি। ‘তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অফিস থেকে বেরুলে?’

‘হু।’ রাতুল কি যেন ভাবছিল। ‘একটা রক্তরাঙা গোলাপ কিনে তোমাকে মনে পড়ল, তাই চলে এলাম। রক্তগোলাপ তো তুমি খুব পছন্দ করতে!’

রিমি যেন একটু নষ্টালজিয়ায় ডুবে গেল। হ্যাঁ, রক্তগোলাপ সে খুব পছন্দ করতো। রাতুল যখন তার সবকিছু ছিল। এখন গোলাপ কেন, কোন ফুলই সে আর আলাদাভাবে দেখে না। আর তার স্বামী ওসব ফুলটুলের আদিখ্যেতা পছন্দ করে না। সে থাকে তার স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বিজনেস, শেয়ারবাজার ওসব নিয়েই। একবার পথের পাশে তাজা রক্তগোলাপ দেখে রিমি আফতাবের কাছে আবদার ধরেছিল, ‘এক তোড়া গোলাপ কিনে দেবে?’ আফতাব গাড়ির ভেতরে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে ভুরু কুচকে বলেছিল, ‘গোলাপ? গোলাপ দিয়ে কি করবে?’

রিমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিল। ঠিক তো! গোলাপ দিয়ে সে কি করবে? ফুলের মর্যাদা তখনই বাড়ে যখন ভালবেসে কেউ কাউকে দেয়। যেমন রাতুল তাকে দিতো।

পরক্ষণেই আফতাবের চোখে ক্রুরতা ফুটে উঠেছিল। সামনে ড্রাইভার থাকায় চাপা গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিল, ‘ও, রক্তগোলাপ দেখে রক্তে নাচন লেগেছে? পুরোনো প্রেম উথলে উঠছে। ওকে দেবে নাকি? যে তোমাকে গোলাপ দিতো। রক্তগোলাপ। গোপনে গোপনে এখনও গোলাপের অভিসার চলে নাকি?’

রিমি একটু বিপন্ন হেসে বলল, ‘কই আমার রক্তগোলাপ? কতদিন কেউ আমাকে গোলাপ দেয়নি!’ দীর্ঘশ্বাসের সাথে কথা কটি বলল রিমি।

রাতুল বোকার মত কাগজের প্যাকেট বাড়িয়ে দিল রিমির দিকে। রিমি প্যাকেটটা হাতে নিল। দোমড়ানো মুখ খুলে রক্তগোলাপ দেখে রাতুলের দিকে তাকিয়ে সরল হাসি দিল। ‘তুমি এখনও ঠিক আগের মতই আছো। একটুও বদলাওনি। আগেও যেভাবে লুকোচুরি করে গোলাপ আনতে, এখনও তাই।’ রিমির মুখ হাসিতে উজ্জল হয়ে উঠল।

গোলাপটাকে বের করে উচ্চুসিত ভাবে শুকল একটু। বুকের কাছে ঠেকিয়ে রাখল। রাতুল বুঝল আজ তার গোলাপ কেনা সার্থক হয়েছে। রাতুল উঠে দাড়াল। গুন্ডাটা কখন চলে আসে কে জানে?

রিমি গোলাপ হাতে রেখেই বলল, ‘এ্যাই, এ্যাই উঠছো কেন?’

‘না, মানে অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। আর তোমারও গোছানোর প্রস্তুতি আছে।’

‘তাই বলে খালি মুখে উঠবে? একটু বসো। আমি কফি বানিয়ে আনছি। তোমার সাথে বসে আমি নিজেও কফি খাব। পুরোনো দিনের মত।’ রিমি আর বসল না। গোলাপ হাতে নিয়েই ভেতরে দৌড়ে গেল।

রাতুল বসল। ট্রেতে করে কালো মগে দুমগ কফি নিয়ে এলো রিমি। তখনও তার হাতে ফুলটা ধরে রেখেছে। আজ বোধহয় ও ফুলটাকে আর হাতছাড়া করবে না। ভাবল রাতুল।

কফি খেয়ে যখন রিমিদের ফ্লাটের গলি দিয়ে রাতুল বের হচ্ছে তখন গলির ভেতরে ঢুকতে থাকা কালো রঙের একটা গাড়িকে ভালভাবে লক্ষ্য করেনি রাতুল। লক্ষ্য করলে দেখতে পেতো তার ভেতর থেকে তী´দৃষ্টিতে আফতাব তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টির ক্রুরতা মানুষের বুকের ভেতরটা কাপিয়ে দেয়।

গভীর রাতে প্রথমে কলিংবেল, তারপর দরজায় প্রবল বেগে কড়ানাড়ার শব্দে রাতুলের ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ি দেখল। পৌনে তিনটা। এতো রাতে কে আসবে? ডিজিটাল যুগে কন্ট্রাক্ট না করে কি কেউ আসে? ডাকাত পড়ল নাতো।

রাতুল ভয়ে ভয়ে উঠল। ফ্লাটের সবগুলো ঘরের আলো জ্বেলে দিল। তারপর দরজার এপাশে এসে কাপা কাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’

ডাকাতরা নিশ্চয় পরিচয় দিয়ে ডাকাতি করে না। কিন্তু ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘রাতুল সাহেব?’

‘জ্বি বলছি।’ দরজার এপাশ থেকে রাতুল বুঝতে পারল না কারা হতে পারে।

‘দরজা খুলুন। আমরা থানা থেকে এসেছি। ওয়ারেন্ট আছে।’

রাতুল দরজা খুলল। সত্যি পুলিশের পোশাকে তিনজন এসেছে। তার পেছনে বাড়িওয়ালা, কেয়ারটেকার, দারোয়ান।

পুলিশ ভেতরে ঢুকল না। ‘আপনাকে আমাদের সাথে একটু থানায় যেতে হবে।’

‘কেন?’ রাতুল বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল।

‘একটা গোলাপের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন আছে?’ পুলিশ নাটকীয়ভাবে বলল।

‘গোলাপের ব্যাপারে?’ রাতুলের বিস্ময় সীমা ছাড়িয়ে গেল। কি ঘটছে সে কিছুই বুঝতে পারল না।

‘হ্যা। রক্তগোলাপ।’ পুলিশ আরো অধিক নাটকীয়ভাবে একটা লালগোলাপ ফুল রাতুলের সামনে ধরল।

দেখেই রাতুল চমকে উঠল। এই রক্তগোলাপটাই তো সে রিমিকে দিয়ে এসেছিল। তাহলে এটা পুলিশের কাছে এলো কিভাবে? তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। মাথা চক্কর দিতে লাগল।

‘গোলাপটাকে কি আপনি চিনতে পারছেন?’ পুলিশ মজা পাওয়া স্বরে জিজ্ঞেস করল।

রাতুল উপর নিচ মাথা নাড়ল। কথা বলার শক্তিও তার নেই যেন। কোনমতে বলল, ‘এটা আপনি পেলেন কিভাবে?’

‘আমাদের সাথে চলুন। আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। আমরাও আমাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব।’ পুলিশটা বেশ রসিক টাইপের মনে হচ্ছে।

পুলিশের গাড়ি কিন্তু থানায় গেল না। রাতুলের চেনা পথেই এলো। রিমিদের ফ্লাটের সামনে এই রাতেও লোকজনের ভীড় দেখে রাতুলের বুক কাপতে লাগল।

পুলিশের সাথে রিমিদের ফ্লাটে উঠল। হাতকড়া পরানো অবস্থায় আফতাবকে ভাবলেশহীন দেখাতে লাগল। শুধু রাতুলের দিকে সে হিংস্র দিকে তাকাল। রাতুল তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে?’

আফতাব কোন উত্তর দিল না। থু করে এক দলা থুতু তার দামি লাল কার্পেটে ফেলল।

বেডরুমের বিছানার উপর সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা লাশ। রাতুলকে নিয়ে পুলিশ সাদা চাদর তুলে ফেলল।

রাতুলের মাথা ঘুরে উঠল। সেই টকটকে লাল শাড়ী আর লাল বøাউজ লাল রক্তে মাখামাখি। একটা দোমড়ানো মোচড়ানো রক্তগোলাপের মতই বিছানার উপর পড়ে আশে রিমি। মৃত রক্তগোলাপ!

আফতাবের সামনে রাতুলকে আনতেই আফতাব চিৎকার জুড়ে দেয়, ‘আমাকে হাতকড়া পরিয়েছেন কেন? আমি কি করেছি? ওই হারামজাদাই আমার স্ত্রীকে খুন করেছে। ওকে এ্যারেস্ট করুন। আমাদের সুখের সংসারে ওই আগুন জ্বালিয়েছে। তার কি কোন অপরাধ নেই? আমার বিয়ে করা স্ত্রীকে ও রক্তগোলাপ দেয় কোন সাহসে? ওই সময় ওই হারামজাদাকে সামনের মাথায় পেলে ওকেও খুন করে ফেলতাম। এক খুনে যে সাজা। দুই খুনে তো তার বেশি তো হবে না। মৃত মানুষকে তো আর দুবার ফাঁসি দেয়া যায় না।’ থানায় নেয়ার পথেও আফতাব তার রোষ ঝাড়তে লাগল।

রিমির মৃত্যুতে রাতুল মুষড়ে পড়েছে। প্রেমিকা অন্যের হয়ে যাওয়া আর মারা যাওয়া মধ্যে ব্যাপক ফারাক আছে। অন্যের হয়ে গেলেও কোথায় জানি আশা ঝুলে থাকে!

এদিকে থানা পুলিশ রাতুলকেও বেশ হেনস্থা করতে লাগল। পরকীয়ার বলি হিসাবে তাকে থানায় আটকেছিল। উকিল ধরে জামিন নিতে হয়েছে। তারপরও মাঝে মধ্যে হাজিরা দিতে হয়। অফিসে ঘটনা অন্যরকম ছড়িয়েছে। রাতুলের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় নিজ স্ত্রীকে দেখে ফেলায় মেয়েটির স্বামী তাকে খুন করেছে। মেয়ে সহকমীরা রাতুলকে এড়িয়ে চলে।

অফিস থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে বাসায় ফিরছিল রাতুল। আগারগাওয়ের কাছে এসে গোলাপ বিক্রেতা সেই ছেলেটাকে মনে মনে খুজতে থাকে। সেদিনের পর থেকে এত ঝক্কিঝামেলা গেছে আর কব্বরের রক্তগোলাপের সাথে খুনের সম্পর্ক থাকতে পারে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

ছেলেটাকে খুজে পায় না। গোলাপ কিনবে ভেবে দুচারজন ছোকরা তার পাশে জুটে যায়। তার মধ্যে একজনকে সে চিনতে পারে। কবরের গোলাপের ইনফরমেশন জানানো ছেলেটা। তাকে ডেকে আড়ালে নেয় রাতুল। অন্যরা অন্য খরিদ্দারের সন্ধানে নামে।

‘এই খানে কব্বরের গোলাপ বিক্রি করত না একটা ছেলে। সে কই?’ রাতুল জিজ্ঞেস করে।

ছেলেটা চমকে ওঠে। চমকানি রাতুলের নজর কাড়ে। ছেলেটা চলে যেতে উদ্যত হয়ে বলে, ‘হে গেছে গা।’

রাতুল চলে যেতে থাকা ছেলেটার হাত খপ করে এটে ধরে। তারপর বলে, ‘কোথায় গেছে?’

‘হ্যার আমি কি জানি!’ ছেলেটা হাত মোচড়াতে থাকে। ‘কব্বরখানায় খোজ লন গিয়া।’ ছেলেটির হাত ধরে রাখা বড় কেউ একজন দেখেছে। কোন ঝামেলা দেখে এগিয়ে আসে, ‘এ্যাই, রইসু কি করছস?’ লোকটা রইসুকে ধমক লাগায়। তারপর রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘স্যার, হে কোন বেয়াদবি করছে নাকি?’

রাতুল দুদিকে মাথা নাড়ায়, ‘এইখানে কবরখানাটা কোনদিকে সেটাই জানতে চাইছিলাম।’

লোকটি ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কবরখানা দেখিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘স্যার, আপনার আপনজন কেউ আছে ওই কবরখানায়?’

রাতুল মাথা উপরনিচ করে হাটতে থাকে।

কবরখানার পাচিলের পাশে খুপড়িমত একটা ঘর। সেখানেই অশীতিপর বৃদ্ধ কবরখানার কেয়ারটেকারকে পাওয়া গেল। কেয়ারটেকার বিশটাকার বিনিময়ে তাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে দিতে বললেন, ‘নতুন একটা কবর আছে। পুলিশী ঝামেলার। ওইদিকটা যাইয়েন না।’

রাতুল শেষ বিকেলের মরে আসা আলোয় কবরখানার চারদিকে চোখ বুলাতে লাগল। কোথাও ছেলেটাকে দেখা যায় কিনা। সেই ছেলেটা নজরে পড়ল না। তবে একটা গোলাপ গাছে টকটকে রক্তগোলাপ ফুটে থাকতে দেখল। রাতুল সেই গোলাপ গাছের দিকে এগুতে গিয়েই থমকে দাড়াল। নতুন কবর। ছোট্ট্র একটা নামফলকও ঝুলছে। দেখেই চমকে উঠল।

আর তখনই মনে হলো পিছনে কে যেন তার শার্টের খুট ধরে টানছে। লাশেরা কবর থেকে উঠে এসে এরকম টনাটানি করে, হরর মুভিগুলোতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে তা কি সম্ভব!

রাতুল পেছনে তাকিয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠল। রক্তগোলাপ হাতে সেই ছেলেটাই দাড়িয়ে। ‘স্যার, আমারে খুজতাছিলেন হুনলাম। তাই কব্বরখানায় চইলা আইলাম।’

রাতুল বলল, ‘তোর হাতের এই গোলাপগুলো কি কবরের উপর থেকে কুড়িয়ে নেয়া।’

ছেলেটি উত্তর না দিয়ে অপরাধীভাবে মাথা নিচু করে রইল। রাতুল পকেট থেকে বিশটাকার নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিয়ে বলল, ‘শোন, প্রতিদিন একটা করে রক্তগোলাপ আমাকে এনে দিবি। তোকে বিশটাকা করে দেব।’ ছেলেটি হাসিমুখে টাকাটা নিল।

‘তবে সেই রক্তগোলাপ কোন কবরে দেয়া গোলাপ হবে না, টাটকা তুলে এনে আমার কাছে দিবি।’ রাতুলের কথা শেষ হওয়ার আগে ছেলেটা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। রাতুল এগিয়ে গেল রিমির কবরের কাছে।

ছেলেটা ফিরে এসে হাপাতে হাপাতে একটা সদ্য ফোটা রক্তগোলাপ রাতুলের হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নেন, স্যার আপনার টাটকা গোলাপ। কব্বরের কিরি কাইটা কইতাছি এইটা কব্বরের উপর থেকে টোকাই নাই। গাছ থাইকা তুইলা আনছি।’

রাতুল রক্তগোলাপটা রিমির কবরের উপর দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলল, ‘এই রক্তগোলাপে এতো রক্ত ছিল আমার জানা ছিল না। তাহলে কোনদিনই তোমাকে গোলাপ উপহার দিতাম না।’

রাতুল ছেলেটাকে বলল, ‘শোন, তুই সেদিন যে গোলাপটা আমাকে দিয়েছিলি তা যে কি করেছে তুই তার কিচ্ছু জানিস না। কিন্তু আজ থেকে তুই আর কব্বরের গোলাপ টোকাবিনে। তোর গোলাপের ব্যবসা করতে যে টাকা লাগে আমি দেব। কি রাজি?’

ছেলেটা পোকা খাওয়া দাতে হেসে বলল, ‘জ্বে স্যার।’

প্রিন্স আশরাফ
কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top