শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬
নিবন্ধ: মাৎসান্যায় ও গোপাল রাজা কর্তৃক পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা
তারেক আলি
শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬
নিবন্ধ
মাৎসন্যায় ও গোপাল কতৃর্ক পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা
তারেক আলি
পৃথিবীর ইতিহাসে হয়তো খুব কম রাজবংশই চারশো বছর রাজ্য শাসন করার গৌরব অর্জন করতে পেরেছে। বলছি এমনই এক রাজবংশের কথা, যারা প্রায় চারশো বছরব্যাপী সতেরো পুরুষ ধরে এদেশে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। তাদের এই অবদান বাংলার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। সেইসঙ্গে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তুলে ধরেছে বিশ্বের দরবারে। তাদের অবদানেই এই অঞ্চলে বহুদিন ধরে বিরাজমান অরাজকতার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। অন্ধকার হতে বেরিয়ে মানুষ দেখেছিল আলোর মুখ। চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি হতে বাংলায় ফিরে এসেছিল সুখ ও শান্তি। বলছি মাৎসন্যায়ের অবসান তথা পাল রাজবংশের উত্থানের কথাই।
শশাঙ্কের রাজত্বের সমাপ্তির পর বাংলায় বিপর্যয় নেমে আসে। কারণ, তার মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে গৌড়রাষ্ট্রে অন্তর্বিদ্রোহ ও কলহের সূত্রপাত ঘটেছিল। ধীরে ধীরে এই অনৈক্য ও আত্মকলহ যেন মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এই শক্তিশালী রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল। এ সময় এখানে অভ্যুদয় ঘটে একাধিক রাজার। এ সকল রাজাদের মধ্যে কেউ এক সপ্তাহ, কেউ আবার এক মাস রাজত্ব করেছিলেন। কেননা রাজ্য বহিঃশত্রুর আক্রমণের কবলে পড়া শুরু করলে একের পর এক আক্রমণ বাংলায় চলতে থাকে। তাই একজনকে পরাজিত করে আরেকজন রাজ্য দখল করায় তাদের কারো রাজত্বই খুব বেশি সময় ধরে টিকে থাকেনি। একসময় এখানে আর কোন রাজার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকল না। তাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাই হয়ে গেল রাজা। বাংলায় সৃষ্ট উক্ত পরিস্থিতির বর্ণনা লামা তারানাথের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়। তার মতে, “In Bhamgala, Odiviśa, etc—the five regions in the east—those who were born in the royal family lived as ministers, brāhmana-s, rich merchants, etc and were lords in their respective spheres. But there was no king as such ruling the state.”১
গৌড়, বঙ্গ তথা সমতটে তখন আর কোন রাজার আধিপত্য নেই। সেইসঙ্গে বাংলায় সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্বও বিলীন হয়ে গেছিল। এই সুযোগে সবাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাবিদার হতে শুরু করল। ফলস্বরূপ বাংলায় ছড়িয়ে পড়ল অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা। সমসাময়িক লিপিতে এরূপ নৈরাজ্যই মাৎসন্যায় হিসেবে পরিচিত। পুকুরের বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে আহার বানিয়ে বেঁচে থাকে, দেশে অরাজকতার সময় সেভাবে বলশালী অবাধে দুর্বলের উপর অত্যাচার করে। এটিই মাৎসন্যায়ের ধারণা। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর অনৈক্য, আত্মকলহ ও বহিঃশত্রুর পুনঃপুন আক্রমণের কবলে পড়ায় শতবর্ষব্যাপী বাংলায় রাজতন্ত্রের এই ধ্বংসপ্রায় অবস্থা বিরাজ করেছিল।
মাৎসন্যায়ের কারণে বাংলার মানুষের জীবনে চরম দুঃখ ও দুর্দশা নেমে আসে। তাই বিরাজমান এই অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভের জন্য বাংলার মানুষ বিশেষ রাজনৈতিক বিজ্ঞতার পরিচয় ও আত্মত্যাগ স্বীকার করে। ফলে দেশের প্রবীণ নেতৃর্স্থানীয় লোকেরা আলাপ-আলোচনায় বসলেন এবং স্থির করলেন যে, পরস্পর বিবাদ–বিসংবাদ ভুলে একজনকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করবেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ মানুষেরাও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করল। যার ফলে এই অরাজকতার মধ্য থেকেই গোপাল রাজা হিসেবে নির্বাচিত হলেন।২ বাংলায় শুরু হল পাল রাজবংশের শাসন। তাদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। গোপালের মাধ্যমে এদেশে অবসান হয় শতবর্ষ ধরে বিরাজমান অরাজকতার। ফিরে আসে শান্তি। দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সেখানকার মানুষেরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এটিই বাংলার ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ বিষয়ে রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, “কেবলমাত্র দেশের মঙ্গলের দিকে চাহিয়া ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জ্জনপূর্ব্বক সর্ব্বসাধারণে মিলিয়া কোনো বৃহৎ কার্য অনুষ্ঠান যেমন বাঙ্গালীর ইতিহাসে আর দেখা যায় না, বর্ত্তমান ক্ষেত্রে এই মহান স্বার্থত্যাগ ও ঐক্যের ফলে বাঙ্গালীর জাতীয় জীবন যে উন্নতি ও গৌরবের চরম শিখরে উঠিয়াছিল, তাহার দৃষ্টান্তও বাংলার ইতিহাসে আর নাই। ১৮৬৭ অব্দে জাপানে যে গুরুতর রাজনৈতিক পরিবত্তর্ন ঘটিয়াছিল, কার্য, কারণ ও পরিণাম বিবেচনা করিলে তাহার সহিত সহস্রাধিক বৎসর পূর্ব্বের গোপালের রাজপদে নির্ব্বাচনের তুলনা করা যাইতে পারে।”৩
পাল বংশের আদি বাসভূমি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে সন্ধ্যাকর নন্দী কর্তৃক রচিত ‘রামচরিত’ গ্রন্থে বরেন্দ্রভূমিকে পাল রাজাদের পিতৃভূমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই তারা যে এই বাংলার অধিবাসী ছিলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। অপরদিকে গোপাল ঠিক কবে রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন, সে বিষয়েও সঠিক কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। ধারণা করা হয় যে, তিনি অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে রাজকার্যে অধিষ্ঠিত হন। সিংহাসনে আরোহনের পর কামকারী বা সামন্তদের দমন করেন রাজা গোপাল। উপরন্তু অনুমান করা হয় যে, গোপাল তার রাজ্যকালে সমগ্র বঙ্গদেশের উপর তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে বহুদিন পর বাংলা সুপ্রতিষ্ঠিত রাজশক্তির সুখ অনুভব করে এবং শান্তি ফিরে আসে এখানে। উক্ত বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে নীহাররঞ্জন রায় বলেন, “গোপালদেব বরেন্দ্র ও বঙ্গে রাজা হইয়াই দেশে অন্য যত ‘কামকারী’ বা যথেচ্ছপরায়ণশক্তি বা সামন্ত বা নায়কেরা ছিলেন তাঁহাদের দমন করেন এবং বোধ হয়, সমগ্র বাঙলাদেশে আপন প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। এই প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইয়াছিল বহু সামন্ত–নায়কের সহায়তায় সন্দেহ নাই; এই সামন্ত–নায়কেরাই তো স্বেচ্ছায় তাঁহাকে তাঁহাদের অধিরাজ নির্বাচন করিয়াছেন।”৪
সমকালীন রীতি অনুসারে কুলগৌরবের দাবি রাজা গোপাল করেননি। উক্ত বিষয়ের উল্লেখও কোথাও পাওয়া যায় না। কেবল পাল রাজাদের তাম্রশাসনে গোপালের পিতামহ দয়িতবিষ্ণু ‘সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত। অধিকন্তু তার পিতা বপ্যট ‘শত্রু দমনকারী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন সেখানে। তাই গোপাল যে কোন রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেননি, তা এখান থেকেই অনুমান করা যায়। এছাড়াও এই উল্লেখের ভিত্তিতে মনে করা হয় যে, যেহেতু গোপালের পিতা যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন, তাই তিনিও পিতাকে অনুসরণের মাধ্যমে সুনিপুণ যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কারণ, বিরাজমান অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের ভার গ্রহণের জন্য যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি নির্বাচন করার প্রয়োজনীয়তা সেখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এদিকে গোপাল ও তার বংশধরগণ সবাই ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। কিন্তু তার জন্ম বৌদ্ধ পরিবারে হয়েছিল, নাকি তিনি পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তা নির্ণয় করা যায় না। জানা যায় যে, গোপাল এই ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিলেন। তার রাজত্বকালেই জনৈক উপাসক ওদন্তপুরি বিহার নির্মাণ করেন। এছাড়াও বৌদ্ধ দার্শনিক শান্তরক্ষিত ছিলেন রাজা গোপালের সমসাময়িক।
পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গোপালের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে। তার অসামান্য অবদানের কারণেই বাংলায় এক নতুন সূর্যোদয় সম্ভব হয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, বাংলায় অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে রাজশক্তির দৃঢ়প্রতিষ্ঠাই গোপালের প্রধান কীর্তি। সেইসঙ্গে তিনি পাল বংশের শাসনের ভিত মজবুত করে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ফলে গোপাল কর্তৃক স্থাপিত শাসনের উপর ভিত্তি করে তার পুত্র ধর্মপাল সাম্রাজ্যের প্রতিপত্তি বিস্তারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, “তাঁহার রাজ্যকালের কোনো বিবরণই আমরা জানি না। কিন্তু তিনি যে শতাব্দীব্যাপী বিশৃঙ্খলার পর তাঁহার রাজ্য এমন শক্তিশালী ও সুসমৃদ্ধ করিয়া যাইতে পারিয়াছিলেন, তাঁহার পুত্র যে সমগ্র আর্য্যাবর্ত্তে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, ইহাতেই তাঁহার রাজোচিত গুণাবলী ও ভূয়োদর্শনের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।”৫
প্রান্তটীকা
১. Debiprasad Chattopadhyaya, ed., Tāranātha’s History of Buddhism in India, trans. Lama Chimpa and Alaka Chattopadhyaya (Delhi: Motilal Banarsidass Publishers, 1990), p. 251.
২. Ibid, p. 257-258.
৩. শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রাচীন যুগ (ঢাকা : দিব্যপ্রকাশ, ২০১৭), পৃ. ৫৪।
৪. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদিপর্ব (কলকাতা : দে’জ পাবলিশিং, ১৪২০), পৃ. ৩৮৫।
৫. শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫।
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়