শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬। কবিতার প্রহর

Spread the love

শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬
কবিতার প্রহর

শব্দকুঞ্জ বৈশাখি ও মে দিবস সংখ্যা-২০২৬

কবিতার প্রহর

ঠিকানাবিহীন পথে 

গোবিন্দ মোদক

রাত্রির অন্ধকার জুড়ে 

          অন্ধকারের ভেতরে 

          আজও জেগে আছি 

মনে হয় আরও কেউ 

          প্রতীক্ষা করে আছে 

          অন্ধকারের ভিতর 

অথচ জানা হয় না 

          একে অপরের 

          রাত শেষ হয়ে যায় 

          সকাল আসে 

দু’জন দু’দিকে চলে যাই 

          ঠিকানাবিহীন পথে 

          অচেনা রয়ে যায় 

          চেনা সময় …

(কৃষ্ণনগর, নদীয়া, ভারত)

 

কোথায় সে জন?

চন্দনকৃষ্ণ পাল

 

কতো সেমিনার সিম্পোজিয়াম হয়

নানা মিডিয়ায় আলোচনা,স্নায়ু ক্ষয়

ব্যাটারী চালিত রিকশা যে ছেলে টানে

এসব খবর এই ছেলেটা কি জানে?

জেনেই কী লাভ,শ্রম কি বন্ধ হবে?

তাদের মাথায় কে হাত রেখেছে কবে?



কালিমাখা মুখে কাগজ কুড়ায় যারা

কখনো ভেবেছি ওখানে কেনো যে তারা

লেদ মেশিনের চাকায় যে হাত রাখে

‘ইশকুলে যাও’,বলতে পারেন তাকে?

‘পিচ্চি’ নামের হোটেলের ঐ ছেলে

দেখেছেন তাকে এই দুটি চোখ মেলে?



সেলুলয়েডের ফিতায় দেখেন ছবি

লিখে চলেছেন প্রিয় লেখক ও কবি

লাইক কমেন্টে ফেসবুক সয়লাব

সমাজটা নিয়ে কী যে আপনার ভাব!

আসলেই সব ভেজাল এবং মেকি

যুগের পরে যুগ  চলে যায়  দেখি-

 

পাল্টায় না তো জীবনের জলছবি

একই ফরমুলা, কেচে গণ্ডুষ সবই

ওদের শ্রমে যে আপনার লোভী হাত

ওদের শ্রমে তো আপনার পেটে ভাত!

শিশু শ্রম যারা প্রতিরোধে দিবে মন

কোথায় বলো তো প্রকৃত সেই জন?

(খিলক্ষেত, লেকসিটি, ঢাকা)

 

রক্তের ভেতর লেখা শ্রমের দিন

রানা জামান

 

শহরের কংক্রিটে আজো শোনা যায় পুরনো স্লোগান

মে মাস মানেই ক্যালেন্ডারে তারিখ না-মুঠোভরা আগুন

ঘাম শুকিয়ে গেলে ইতিহাসও ফিকে হয়ে যায়

কারখানার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক বিদ্রোহ।

শ্রমিকের হাত—সময়ের সবচেয়ে প্রাচিন কবিতা

যেখানে শব্দ নয়, রক্তই লিখে যায় অধিকার

যন্ত্রের শব্দে চাপা পড়ে মানুষের নিঃশ্বাস

অথচ সেই নিঃশ্বাসেই জন্ম নেয় নতুন পৃথিবী।

 

তুমি কি শুনতে পাও সেই ভাঙা হুইসেলের ডাক?

নাকি মোবাইল স্ক্রিনে আটকে গেছে সব প্রতিবাদ?

মে দিবস এখন শুধু ছুটি—এই ভ্রান্ত ধারণা

আসলে এটা প্রতিদিনের অসম যুদ্ধের নাম।


শ্রম মানে শুধু কাজ নয়, অস্তিত্বের দাবি

ক্ষুধার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নিরব বিপ্লব

প্রতিটি ইটের ভেতর আটকে আছে কারো জীবন

প্রতিটি সেতুতে লেখা আছে অবহেলার ইতিহাস।

 

মানুষ হারে না—এটাই সবচেয়ে বড় সত্য

মে দিবস তাই শেষ নয়, শুরু হওয়ার গল্প

রক্ত শুকালেও স্মৃতি শুকায় না কখনো

শ্রমিকের স্বপ্নই পৃথিবীর আসল নির্মাণ।

(ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ)

উদ্যমে গোলাপ

নিলয় রফিক 

( উৎসর্গ, লিমা হাসান,আমেরিকা প্রবাসী) 

 

পোড়াবাড়ির শেকড়,স্বপ্নের শহরে

আলোর পাঠশালায় বৃক্ষের রোপণ 

কাঁচিঝুলি তপস্যার নিসর্গ আলয়

জানালার আকাশে ফোটে জীবনের ঘ্রাণ

 

ব্রাহ্মপুত্র নদেপাড়ে জয়নুলের স্মৃতি 

শিল্পের বুনন দেখে দূরের নজর

ঘুম নেই আঁখিপাড়া রথের সোপান 

ভেঙেচুরে দিচ্ছে ডাক নতুন আলোয়

 

ডানামেলে ঘুরে ফিরে উদ্যমে গোলাপ 

স্বর্গের উঠোনে দেহ যুগল বন্ধন

পাখির জীবন খুঁজে সভ্যতার দেশে

মহাসাগরের তীরে সবুজের গান

(কক্সবাজার, বাংলাদেশ)

তিনটি কবিতা

রথীন পার্থ মণ্ডল

 

খোঁজ

তোমায় দাঁড়াতে বলেছি, পালাতে বলিনি

পালাতে বলিনি জীবন থেকে

এমনকি জীবন থেকে ছেড়েও চলে যেতে বলিনি

 

তোমায় খুঁজতে বলেছি, হারাতে বলিনি

হারানো সহজ বলে হারিয়ে যেতেও বলিনি

হারাতে বলিনি নিজেকে অন্ধকারের মাঝে

 

তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে

তোমার সাথে পথ হারাতে হারাতে

তোমার সাথে বাস করার জন্য

আমি একটা শহর চেয়েছিলাম

যা আজও আমি খুঁজে চলেছি।।

 

ঠিকানা পেলাম না

কিছুই দিলে না আমায়

না ভালোবাসা, না শান্তি

ঠিকানা পেলাম কই?

শূন্য হাতেই ফিরতে হয় আমাকে


শূন্য থেকেই শুরু হয় সব 

শুরু হয় সকাল

শুরু হয় ভালোবাসা

শুরু হয় নতুন লড়াই

 

আসলে তোমার কাছে 

বড্ড বেশি চেয়ে ফেলেছি আমি 

তাইতো খালি হাতেই ফিরতে হয় আমাকে 

এরপর কিছুই চাওয়ার থাকে না আর

 

ধীরে ধীরে কখন যে আমি একলা হই

তা বুঝতে আর পারি না।।

 

মাঝদরিয়া

রাত্রির বুক চিরে নেমে আসে মেঘ

তোমার ভালোবাসা মাখা হাতের স্পর্শে

একদিন ভেঙেছিল ঘুম।

ঘুম ঘুম চোখে দেখেছিলাম 

তারাদের আনাগোনা,

তুমি তো ছিলে আমারই পাশে

হাতে হাত রেখে… 

দমকা হাওয়ায় নিভে গেল সব

অন্ধকারে তোমার হাত হাতড়াতে হাতড়াতে 

মাঝদরিয়ায় ভেসে চলি

কিনারার খোঁজে।।

(পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ)

বৈশাখ—মুখোশের ভেতর ধুলা 

ওয়াসীম ফিরোজ

 

বৈশাখ ঢোকে জানালার ফাঁক বেয়ে ধুলার মতো নরম অথচ অস্থির—

চোখে লাগে দাঁতের ভেতর কড়মড় জিভে কাঁচা মাটির তিতা

 

রোদ নামে খোলা চামড়ায় লবণের মতো চাপ—

ঘাম গড়িয়ে পড়ে কলার ভাঁজে ভাঁজে আর হাঁসফাঁস করে দুপুরের নীরবতা

 

শিশুরা রঙ মাখে মুখে—কপালে বাঘ দাঁড়িয়ে থাকে

চোখের নিচে লাল জমে যায়,

কথা বললেই তা ছড়িয়ে পড়ে নিঃশ্বাসে

 

পুকুরপাড়ে ভেজা মাটি ভেঙে যায় পায়ের নিচে—

কারা যেন হাঁটছিল আগে,

এখন শুধু দাগের ভেতর দাগ

 

ঢাক বাজে কোথাও নয়—হাওয়ার ভেতর ফাঁক তৈরি করে,

শব্দ উঠে আসে আবার হারিয়ে যায় নিজেরই ভেতরে

 

মুখোশ বাড়ে—চোখ ঢেকে দেয় ধীরে ধীরে,

হাসি থেমে যায় দাঁতের পেছনে,

মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকে শুধু ভেতরের অনুপস্থিতি নিয়ে

 

রঙ নামে লাল নীল হলুদ একসাথে মিশে গিয়ে কাদা হয়ে যায়—

পায়ের নিচে পিছলে পড়ে উৎসব

 

মানুষ বের হয় রাস্তায় মুখ খোলা মুখহীন মুখ—

ভিড় তাকে চেনে না, সেও আর কাউকে আলাদা করে দেখে না

 

শেষ বিকেলে হাওয়ায় একটা ভাঙা ঢাকের টুকরো ভেসে যায়—

তার ভেতরে কেউ নেই, তবু শব্দটা থেকে যায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে

(কিশোরগঞ্জ, বাংলাদেশ)

শেষ কথা নয়

আরেফিন অনু

 

সময় একদিন পাথরের ভেতর ঢুকে

জল হয়ে গিয়েছিল—

সেই জলের ভিতর ডুবে আছে অগণিত অসমাপ্ত উচ্চারণ।

 

কিছু শব্দ জন্ম নেবার আগেই ঘ্রাণ শুকিয়ে যায়,

কিছু প্রতিশ্রুতি শৈবালের মতো লেগে থাকে

অচেনা কোনো তীরে।

পাহাড় ভুলে গেছে চুম্বনসিক্ত ঠোঁটের সূত্র

সমুদ্রও রাখেনি হিসাব

কত অনুচ্চারিত শব্দ ভেসে গেছে লবণজলে।

তবু মনে হয়—

পৃথিবীর সব থেকে জরুরি কথটি-ই

কোনো ইতিহাসে নেই।

 

অক্টোবরের গোপন লেখা হয়নি কোনো বিপ্লবের পতাকায়,

ডালিমের ফুল ছুঁয়ে দেখার প্রথম সকালও।

সে লুকিয়ে থাকে-

নীরবতার মাঝখানে,

দুটি মানুষের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা দূরত্বে।

 

শেষ কথা বলে কিছু নেই

নির্জন উঠোনে পাশাপাশি থাকা ছায়া-

বার বার ভুলে যায় ‘সন্দেহ’ এক অসুখের নাম। 

বিভক্ত যাপন টুকে রাখে নিষিদ্ধ মদের কটুগন্ধ যদিও

একই আলোতে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে দ্বিধাগ্রস্ত সকল ব্রত।

(ঝিনাইদহ, বাংলাদেশ)


নদী

আরিফ মোর্শেদ

 

নদী, আমি সাঁতার জানিনা-

তোমার খুব কাছে কিভাবে আসি!

 

তুমি হাঁটো

শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নীরব স্রোতের মতো,

যেখানে শব্দেরা ডুবে যায়, আর

চোখেরা শিখে নেয় গভীরতা।

 

আমি দাঁড়িয়ে থাকি তীরে,

পকেটে কিছু অপ্রকাশিত ভয়,

আর বুকের ভেতর

ভিজে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে।

 

তোমার হাসি ঢেউ তোলে,

কিন্তু ডাকে না ঐ ঠোঁট!

তোমার নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক

ওটা সাঁতার না জানা মানুষকেও

বানের অতলে ঠেলে দেয়।

 

আমি জানি,

ভালোবাসা মানে ঝাঁপ দেওয়া নয় সময়-অসময়

কখনো কখনো

ডুবে যাওয়ার আশঙ্কাকে

বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাও ভালোবাসা।

 

নদী,

যদি কখনো হাত বাড়াও

আমি ডুববো না, কথা দিচ্ছি।

আমি শুধু শিখে নেব

তোমার পাশে ভিজে থাকার প্রিয় সব ভাষা।

(চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ)

 

ছায়া
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

তোমাকে রেখে অনেকটা দূর চলে গেছে ছায়া
যেমন ঢেউ ছেড়ে গেলে মরে যায় চঞ্চলা-নদী
বৃষ্টি না এলে কাঁদে অপুষ্ট শস্যকণা
এমন পাথর-ভূমে নিষ্পলা কৃষক তুমি।

জানো?
সে এখন কাঠুরের হাতে নিহত গোলাপ
জলচ্যুত মাছ যত কাছে দেখে মৃত্যু
যেমন অসহায় সুতো-ছেঁড়া শূন্যের ঘুড়ি
তত কাছে দুঃখ বাঁধে ঘর, বিপন্ন হরিণী।

নগরে বসন্ত এলে তুমি শীতঘুমে বন্দী
চারদিকে পৌরাণিক দেহ, পর্বতজুড়ে লাশ
অমাবস্যার ভেতর বেহুলার চাঁদ-শরীর জানে
তেরো-নদীর জলে ডোবে তোমার বিষণ্ন ছায়া।

(ঢাকা, বাংলাদেশ)

কৃষকের স্বপ্ন পানির নিচে 

মোঃ সৈয়দুল ইসলাম 

 

কৃষক স্বপ্ন দেখে—

সোনার ধানে ঘোলা ভরবে,

রোদ পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে

সকাল সন্ধ্যা জমিতে তাঁর স্বপ্ন বুনে;

দিনরাত কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

দিন বদলের স্বপ্নে হাজারো কষ্ট বুকে ছাপা দেয়;

ধীরে ধীরে সোনালী ফসল সূর্যের মতো উঁকি মারে।

কৃষকের মনে কি যে আনন্দ! 

দেখেই যেনো শান্তি, 

ফসল ঘরে উঠবে

সবার মুখে হাসি ফোটবে,

ফসলের মাঠে হঠাৎ নেমে এলো কালোছায়া;

কালবৈশাখীর তাণ্ডব বলে কথা, 

চারদিকে নেমে এলো ঘনকালো অন্ধকার ;

শনশন বাতাস বইতে শুরু করলো,

সাথে বৃষ্টি আর শিলাবৃষ্টির তাণ্ডব,

দিনরাত একটানা ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতা দেখা দিলো।

হাওরে পাকা ধান যেনো কাছে ডাকে;

দেখলে হৃদয় জুড়িয়ে যায়, 

কিন্তু, ভারি বর্ষণে সোনার ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।

কি নিদারুণ কষ্ট! 

বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্রমিক সংকট,

দিকে দিকে কৃষকের বুকফাটা আর্তনাদ!

কে দেখে কার ক্ষতি

সব কৃষকের একই গতি,

কৃষকের স্বপ্ন যেনো পানির নিচে। 

(সুনামগঞ্জ, বাংলাদেশ)

 

“এসো বৈশাখ”

  শাম্মী তুলতুল

 

এসো বৈশাখ আমার দ্বারে

বৈশাখের রঙ ফিরে আসুক সবার ঘরে ঘরে।

নতুন ভাবে সাজাই সবে 

আমেজ  ভরে যাক দেশে দেশে।

বাঙালি খায় পান্তা -ইলিশ

স্বাদ নেয় বাংলার ঐতিহ্যের মিলমিশ।

রঙীন শাড়ি পড়ে মাথায় গোলাপ গুঁজে

হাতে হাত ধরে যাবে বৈশাখী মেলাতে।

তাই বার বার  ফিরে আসুক  

আমাদের  পহেলা বৈশাখ নিজ রঙে রাঙিয়ে।

(চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top